Home » ইভটিজিংমুক্ত বাংলাদেশ চাই » নারীর পোশাক,ইভ টিজিং ও ‘শ্লীলতাহানি’ এবং কিছু মানুষের ভাবনা

নারীর পোশাক,ইভ টিজিং ও ‘শ্লীলতাহানি’ এবং কিছু মানুষের ভাবনা

625 বার পঠিত

অনেকেই মনে করেন এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনাও করেন ইভ টিজ এবং নারীর ‘শ্লীলতাহানি’ এর জন্য নারীর ‘অশালীন,ঔদ্ধতপূর্ণ’ পোশাকই দায়ী। আমি অত্যন্ত বিনীতভাবে বলতে চাই যে, না তা আদৌ নয়! এক্ষেত্রে পোশাক ইভ টিজিং এবং ‘শ্লীলতাহানি’ এর একটি ফ্যাক্টর হলেও এর ভূমিকা এই সম্পৃক্ত আলোচনাতে এতটাই গৌন যে এটি ইভ টিজিং এবং ‘শ্লীলতাহানি’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা করা মানেই বিষয়টিকে অন্য খাতে নিয়ে যাওয়া। নিজের বাড়িতে নিজের অতি আপনজন দ্বারা যখন একজন নারীর (যেকোন বয়সের নারী)‘শ্লীলতাহানি’ ঘটে তখন সেই নারীর বয়স,পোশাক বা জ্ঞাতিসূত্র কোনটিই  বিবেচনাতে আসেনা। অথবা একজন  পর্দা করা বা বোরকা পরিহিত নারী রাস্তা দিয়ে চলার সময় হঠাৎই তার কোন অঙ্গে অন্য কোন পুরুষের স্পর্শ পান বা কোন মন্তব্য শোনেন, সেখানেও কি পোশাক কোন ভূমিকা আদৌ রাখে? যে পুরুষ নারীদের ‘অশ্লীল’ পোশাক বা ‘খোলামেলা’ পোশাকে দেখলে আকৃষ্ট হন,তার মাঝে কামোত্তেজনার সঞ্চার হয়, সেই একই পুরুষই কিন্তু বোরকা পরিহিত নারীদের শরীরের বিশেষ অঙ্গে হাত দেবার ‘আনন্দ’  থেকে নিজেকে রুখতে পারেন না। তবে?

কোন মেয়েকে কখনও টিজিং এর মুখোমুখি হতে হলে দেখা যাবে আশেপাশের মানুষজন প্রতিবাদ করার চেয়ে মেয়েটির চারিত্রিক দোষাবলী খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মেয়েটির পোশাক কেমন ছিল বা ‘স্বভাব’ মোটেও ভালো ছিল না ইত্যাদি গবেষণামূলক মন্তব্য করা যেন তাদের কাছে অত্যাবশ্যকীয় রূপে আবিভূত হয়! যে টিজ করলো তার মোটেও কোন দোষ আর থাকে না;বরং মেয়েটিই হয়ে যায় কালপ্রিট! আপন মামা বা কাকা যখন উঠতি বয়সের ভাগ্নীর শরীরের কোন বাড়ন্ত অঙ্গে নিছকই স্নেহের ভনিতায় আদর করার ভঙ্গিতে সুযোগ বুঝে ‘চাপ’ দেন বা ‘টিপে’ দেন; তখন পোশাকের বাহল্য আলোচনা ম্লান হয়ে যায়। চিন্তা করুন সেই নারী শিশুটির কথা,যে কিনা এই ঘটনা নিজের মাকেও বলে বিশ্বাস করাতে পারেনা এবং এক সময় যখন বুঝে যায় যে মা বিশ্বাস করবেন না, তখন এ ধরনের বিষয়গুলো নিজের মনের ভেতরেই চেপে যাওয়ার অভ্যাস তৈরী করে ফেলে। তখনও হয়তো সেই মা মেয়েকে বকা দিয়ে বলেন,‘তুমি আর ফ্রক পরবে না বা কতবার বলেছি ওড়নাটা টিক করে পরতে অসভ্য মেয়ে’!!! যেন ওড়না ঠিক করে পরলেই আর তার মেয়েকে হেনস্থা হতে হবেনা বা তাকে এই ধরনের ‘আজগবি’ কথা শুনতে হবেনা! সেই নারী শিশুটির জন্য কতটা নির্মম সেই অভিজ্ঞতা সেটা বোধকরি অন্য কারও পক্ষে প্রকৃত অর্থেই অনুধাবন করা আদৌ সম্ভব নয়।

যত ‘উন্নত’ সমাজই বলা হোক না কেন আসলে সব জায়গার নারীদের অবস্থাই একই; হয়তো প্রেক্ষাপট বা চিত্রায়নটি ভিন্ন। আর এ ধরনের টিজিং অথবা যৌন হয়রানির জন্য পোশাক কখনও মুখ্য হয় না। পোশাক হলো শুধুমাত্র আমাদের উছিলা। এই উছিলা ব্যবহার করে আমরা সবাই নিজেদের দোষ , অপারগতা আড়াল করতে চাই; এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। আসুন আমরা সকলে ঘর থেকেই শুরু করি নিজেদের সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার লড়াই। এই লড়াই শুধু নারীর নয়;সকলের লড়াই। আমাদের প্রকৃত প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। শুধু সমস্যা বের করলাম বা জানলাম, শুনলাম ,এতটুকুতেই যেন আমরা সীমাবদ্ধ হয়ে না যাই। এই নেতিবাচক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে আসুন আমরা সবাই  আসল অপরাধ আর অপরাধীকে চিনতে শিখি,ভুক্তভোগীর মনকে বুঝতে ও গুরুত্ব দিতে শিখি এবং নিজেরাই নিজেদের মনকে প্রতারণা করা থেকে বিরত রাখি। হয়তো এই চর্চাই আমাদেরকে একদিন নারী-পুরুষের সম্মানের সাথে একসাথে চলতে শেখাবে এবং নারী ‘বিনোদনের উপকরণ’ এই লালসাপূর্ণ  মনোভাবের অবসান ঘটবে। প্রাইভেট বা পাবলিক পরিসরে নারী হয়তো একদিন আর নিরাপত্তাহীণতায় ভুগবে না;নির্ভীক মনে জয় করতে পারবে সকল  ক্ষেত্রকে।

মন্তব্য
  • Nur-e-elahi এপ্রিল 23, 2012 at 3:29 অপরাহ্ন

    ধন্যবাদ ইশিতা বিনতে শিরিন নজরুল ! তবে যত কথায় লিখুন আর যেভাবেই লিখুন, শেষ পর্যন্ত পবিত্র কোরআনের আদেশ নিষেধ মেনে চলার অভ্যাস করা ছাড়া কোন পথ নেই।

  • Eshita Binte Shirin Nazrul এপ্রিল 22, 2012 at 10:59 পূর্বাহ্ন

    ধন্যবাদ সবাইকে।আসুন আমরা আমাদের ঘর থেকেই শুরু করি অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই। আজ হয়তো কোনঠাসা হয়ে পড়বো;কিন্তু একদিন আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম অবশ্যই এর সুফল ভোগ করবে।

  • এহসান রাজন এপ্রিল 21, 2012 at 11:34 পূর্বাহ্ন

    একটা প্রচন্ড সত্যি কথা বলেছেন অসাধারণভাবে… ধন্যবাদ আপনাকে…

  • BILASH BRISTY এপ্রিল 21, 2012 at 10:57 পূর্বাহ্ন

    একদম ঠিক বলেছেন ভাই। আমি আপনার সাথে একমত।

  • Al Masud এপ্রিল 21, 2012 at 10:06 পূর্বাহ্ন

    আমরা এমন এক সমাজ ব্যবস্থার ভিতরে আছি যেখানে নারী ‘দাসী’। ব্যাভিচারের জন্য দোষী হিসেবে দায়ী করা হয় নারীকে; এই সমাজে নারীর ত্রুটি বড় করে দেখা হয়। নারী ধর্ষিত হলেও দোষ বর্তায় ঐ নারীটির দিকে। ইভটিজিংয়ের ফলে নারী নির্যাতিত হয় তবুও সমাজ দোষ খোঁজে নারীর; যেন নারী বিরাট অপরাধ করে ফেলেছে। নারীদের প্রতি পুরুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও অপরাধ কে সার্বজনীন ও স্বাভাবিক ভাবা হয় এই সমাজে।
    Eshita Binte Shirin Nazrul আপনাকে অসংখ ধন্যবাদ সুন্দর করে ইভটিজিং বিষয়ে অতিবাস্তব সত্য একটি প্রতিবেতন লেখার জন্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। প্রথম আলো ব্লগে আমার প্রথম পোষ্ট ছিলো- ‘ইভটিজিং’

  • masud khan এপ্রিল 21, 2012 at 9:22 পূর্বাহ্ন

    পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা অপদস্থ হয়েই যাচ্ছে _ সেটা কখনো কখনো পোশাকের বাইনা ধরে, আবার কখনো কখনো পুরুষের কাম উত্তেজনা নিবারন করার জন্য হলেও । আমরা নৈতিক ভাবে উঁচু স্তরে যেতে না পারলে নারীরা চিরকাল ই সেবা দাসী হয়ে থাকবে । আমাদের সমাজে নারী পুরুষ ভেদে অপরাধ যেমন ভিন্ন হয়ে থাকে ঠিক তেমনি অপরাধের শাস্তির মাত্রা ও ভিন্ন হয়ে থাকে । আবার সমাজে মান মর্যাদার ও তফাৎ পরিলক্ষিত হয় ।

    আপনাকে ধন্যবাদ একটি সত্য কে সবার সামনে আবার নতুন করে তুলে এনেছেন । এ বিষয়ে আমার একটি লিখা আপনি চাইলে পড়তে পারেন -

    http://www.bodlejaobodledao.com/archives/15413#comment-5027

  • বদলে যাও বদলে দাও এপ্রিল 19, 2012 at 9:29 অপরাহ্ন

    Eshita Binte Shirin Nazrul আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের, নোংরা মনের পুরষদের প্রকৃত মনস্তাত্বিক বিষয়টি আপনি অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এটাই সত্য। আসলে যারা পোশাক নিয়ে একগুয়েঁ অন্ধ যুক্তি দেয়, কথায় কথায় ধর্মের দোহাই টেনে আনে তাদের উপলদ্ধির জন্য এই লেখাটি পড়া খুব জরুরি। আমাদের সমাজে অনেককিছু ভুল ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ দেয়া হয়। অনেক নষ্ট বিশ্বাসের উপর আমরা নির্দেশিত হই। আপনাকে ধন্যবাদ সাহসী যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য দেয়ার জন্য। বদলে যাও বদলে দাও মিছিল আপনার মত শত শত ঈশিতাকে গড়ে তুলতে চায়। আপনি নতুন প্রজন্মের ঈশিতাদের এখানে পথ দেখাবেন, তাদের সাহস যোগাবেন এটাই প্রত্যাশা করি।

© বদলে যাও, বদলে দাও!