Home » অন্যান্য » পাঠকের খোলা চিঠি – “খবরদার কখনো কাঁদবে না”

পাঠকের খোলা চিঠি – “খবরদার কখনো কাঁদবে না”

305 বার পঠিত

পাঠকের খোলা চিঠি

খবরদার কখনো কাঁদবে না

অনলাইন ডেস্ক | তারিখ: ২৩-০৩-২০১২

http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-03-23/news/234915

undefined

পাকিস্তানের কাছে মাত্র দুই রানে হেরে যাওয়ার পরে গতকাল অঝোরে কেঁদেছিলেন মুশফিকুর রহিম। মুশফিকের কান্নায় কেঁদেছিল বাংলাদেশ। তবে সেই কান্নাতে প্রাপ্তিও কিছু কম ছিল না। আজ প্রথম আলো অনলাইনে হাজারও পাঠকের মন্তব্যে জানা গেছে সে কথাই। পাঠকের এসব মন্তব্যের ভিড়ের মাঝে মো. মনোয়ার মোকাররম (md.manuar@gmail.com) নামের প্রথম আলোর একজন পাঠক একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন। সেখানে মুশফিক বাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন সুখে-দুঃখে সব সময় তাঁদের পাশে আছে বাংলাদেশ। প্রথম আলো কার্যালয়ে আসা পাঠকের সেই চিঠিটি এখানে প্রকাশ করা হলো।

সুপ্রিয় মুশফিক,
শেষ বলে যখন চার রান দরকার তখনো আমরা আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। একটাই তো বল বাকি, একটাই শট দরকার। ক্রিকেটে কত কিছুই হয়, ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। হলো না, ক্রিকেট যে গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা—এটা প্রমাণ করার জন্যই বোধহয় হলো না। কিছুক্ষণের জন্যে মনে হলো পৃথিবীটা থমকে গেছে। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর যে একটা হূিপণ্ড শব্দ করে যাচ্ছিল, হঠাত্ করে যেন সেটার অস্তিত্বও টের পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল আশপাশে কেউ নেই, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আমি একেলা, বসে আছি ‘একা আমি একলা রাতে, এক গ্লাস জোছনা আর এক গ্লাস অন্ধকার হাতে’। চেতনা ফিরে পেলাম হঠাত্ যখন মুহুর্মুহু পটকা ফোটানোর শব্দ শুনতে পেলাম। তাই তো দুঃখ কীসের? যা করেছি তার জন্যই তো আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত। এত কাছে গিয়েও স্বপ্নটা ছুঁতে না পারার যন্ত্রণাটা তো চাপা দিয়েই ফেলেছিলাম। কি দরকার ছিল তোমার মাঠের মধ্যে অমন বাঁধভাঙা কাঁদার। তোমাদের ওই কান্না দেখে আমাদের চোখে আমরা যে বাঁধ নির্মাণ করেছিলাম তা যেন এক ঝটকায় ভেঙে গেল। ৩২ কোটি চোখের বাঁধ ভাঙা অশ্রু! তোমার কী দরকার ছিল ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি চোখকে এই কষ্ট দেওয়ার। খেলার মাঠে একটি দলকে হারতে হয়, তাই তোমরা হেরেছ। তোমরা শুধু কাপটাই জিততে পারনি, আর সবকিছুই জিতেছ, তোমরা ১৬ কোটি বাংলাদেশির হূদয় জিতেছ, বাংলাদেশের বাইরে জিতেছ আরও কোটি কোটি ক্রিকেট ভক্ত মানুষের হূদয়। তোমরাই তো সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন। তার পরও কেন এই অঝোর ধারায় কান্না। তোমাদের কান্না কি আমাদের কষ্ট দেয় না?
আমাদের জীবন কাটে প্রতিনিয়ত চাওয়া-পাওয়ার অসম হিসাব মেলাতে মেলাতে। হাজার দুঃখ-কষ্ট, টানাপোড়েনে যখনই তোমরা মাঠে নাম, আমরা তোমাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। তোমরা ভালো করলে কিছু সময়ের জন্য হলেও আমরা ভুলে যাই দুঃখ-কষ্ট, জীবনের টানাপোড়েন, হিসেব-নিকেশ। তোমরা যখন খেল, আমরা সবাই এক হয়ে যাই। আমাদের হূদয় একটি জায়গায় এসে মিলে যায়, তোমাদের জন্যে শুভ কামনায় আমরা ব্যাকুল হই। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, মাঠে বসে দুই হাত তুলি, ফেসবুকে দেখলাম আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক স্যার ফাইনালে তোমাদের জন্যে শুভ কামনায় নফল রোজা রাখবেন বলেছেন। আমরা সত্যি তোমাদের অনেক ভালোবাসি। তোমাদের কান্না আমাদেরকেও কষ্ট দেয়।
তোমরা চেষ্টা করে যাও। কখনো পার, কখনো পার না। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো আবেগ ধরে রাখতে না পেরে মাঝেমধ্যে তোমাদের সমালোচনা করি। আমাদের বাবা-মায়েরাও আমাদের কত ভালোবাসেন। কিন্তু আমরা যখন দুষ্টুমি করি, পরীক্ষায় ভালো না করি আমাদেরকে কত বকাঝকা করেন। কিন্তু যতই বকাঝকা করুক উনারাই আবার আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আমরাও তোমাদেরকে অনেক বেশি ভালোবাসি।
ফাইনালটা জিতলে তোমাদের হাতে উঠত ট্রফি। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য যে ট্রফি হাতে তুলে নিতে হবে, সেটা ভাবার কোনো কারণ নেই। শুধু ট্রফিটা ছাড়া তোমরা আর সবকিছুই জিতেছ। তোমরা আমাদের অন্তর জিতে নিয়েছ। আমরা যে তোমাদের কতটা ভালোবাসি তা আমরা গতকাল বুঝেছি নতুন করে। এই উপলব্ধির কাছে একটা ট্রফি আর এমন কি? এ রকম ট্রফি জেতার সুযোগ তোমরা শত-সহস্রবার পাবে। এটা তো মাত্র শুরু।
এই টুর্নামেন্টে তোমরা যে খেলা খেলেছ, তাতে তোমরা আমাদের মাথা অনেক উঁচু করে দিয়েছ। হার-জিত খেলার অংশ। খেলার নিয়ম মেনেই একটি দলকে হারতে হয়। কিন্তু শেষ বল পর্যন্ত না হারার যে মানসিকতা তোমরা দেখিয়েছ, আমরা সত্যি গর্বিত। এভাবে যদি তোমরা খেল আর আমরা যদি এভাবে কাঁদাও এই কান্নায় আমদের কষ্ট হয়তো হবে কিন্তু কোনো গ্লানি থাকবে না। গ্লানিহীন পরাজয়, জয়ের চেয়েও কোনো অংশে কম নয়।
তোমরা তোমাদের কাজ করে যাও। আমরা সব সময় তোমাদের সঙ্গে আছি। সামনেই হয়তো আবার পাকিস্তান সফরে যেতে হতে পারে। এ বছরেই আছে টি-২০ বিশ্বকাপ। যে যুগের সূচনা তোমার করলে, সেটা ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
যদি আবার কখনো এমন পরিস্থিতি আসে, খবরদার কখনো কাঁদবে না। যত গৌরব, যত সাফল্য সব আমরা ভাগাভাগি করে নেব। কিন্তু কান্নাগুলো আমাদের জন্য রেখে দাও। আমাদের মাথা থাকবে উঁচু। গ্লানিহীন কান্নার সুযোগ আমাদের খুব বেশি আসে না। ধন্যবাদ তোমাদের এ রকম সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

লেগেছে অমল ধবল পালে
মন্দ মধুর হাওয়া।
দেখি নাই কভু দেখি নাই
এমন তরণী বাওয়া।
কোন সাগরের পার হতে আনে
কোন সুদূরের ধন!
ভেসে যেতে চায় মন,
ফেলে যেতে চায় এই কিনারায়
সব চাওয়া সব পাওয়া।

আমরা তোমাদের সঙ্গে ছিলাম, আছি এবং থাকব। এই কথা আমার, এই কথা সব বাংলাদেশির।

——-

মো. মনোয়ার মোকাররম

(md.manuar@gmail.com)

মন্তব্য
  • shopnoshimahin মার্চ 27, 2012 at 9:14 অপরাহ্ন

    Excellent. মূল কাগজে ছাপা হওয়া উচিৎ, তাহলে হয়ত আমাদের খেলোয়াড়দের নজরে পড়বে।খুবই motivational লেখা। খেলোয়াড়রা বুঝবেন আমরা তাদেরকে আসলে কতটা ভালোবাসি।

© বদলে যাও, বদলে দাও!