কেমন আছে হরিজন সম্প্রদায় ?
বিজ্ঞানের সাফল্য যখন আকাশচুম্বী গোটা পৃথিবী যখন হাতের মুঠোয়। তবুও এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা একটুও পরিবর্তন হয়নি। যে কারণেই রাধিকার মুখের কথাটি শিরোনাম করতে বাধ্য হয়েছি। তার আগে বলি কে এই রাধিকা? ইংরেজিতে sweeper বাংলায় ঝাড়ুদার, কেউ কেউ আবার তাদের সম্মান দেখিয়ে বলেন হরিজন। সমাজে তারা মেথর সম্প্রদায় হিসেবেই গৃহীত স্বীকৃত নিন্দিত ও ঘৃণিত। তবুওতো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও বেঁচে থাকতে হয় এই হরিজনদের। সুখ-দু:খ, হাসি-কান্না,প্রেম-বিরহ-বিচ্ছেদ,নিন্দা,হিংসা,ঘেন্না আর নানান অপবাদ নিয়ে চলে তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সম্প্রতি আমার দুই প্রীতিভাজন বন্ধু চঞ্চল ও উজ্জ্বলকে সঙ্গে নিয়ে রংপুর কারমাইকেল কলেজ গেইটের উত্তর পার্শ্বে বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়ের জীবন চিত্র দেখতে গিয়েছিলাম। থাকার ঘরের পাশে ঝিম ধরে বসে আছেন জগেন্দ্র। তার পাশেই স্ত্রী রাধিকা আমাদের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। দু-সন্তানের জননী রাধিকার বিয়ে হয়েছিল মাত্র সাড়ে নয় বছর বয়সে। পরে জানলাম রাধিকা কারমাইকেল কলেজের মাস্টাররোলের কর্মচারী হিসেবে ঝাড়ুদারের কাজ করেন। আর জগেন্দ্র মেস কিংবা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টয়লেট পরিষ্কারের কাজ করেন। তাদের দু’জনের আয়ে দুই সন্তান লতা (৩) এবং সুমন(৪)-কে নিয়ে সংসার মোটামুটি ভালই চলে। আর্থিক সংকট খুব একটা না থাকলেও মানসিক অশান্তি তাদের কুড়ে কুড়ে খায়। সমাজে তারা সম্মান পায় না। সনাতন ধর্মানুযায়ী নিকৃষ্ট(!) জাতি হিসেবে তারা সমাজের মানুষের কাছে পরিচিত। টাকা থাকা সত্ত্বেও তাদের রেঁস্তোরায় বসে খেতে দেয়া হয় না। এমন অভিযোগের কথা যখন জগেন্দ্র আমাদের জানাচ্ছিলেন, তখন স্ত্রী রাধিকা তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কাদোঁ কাদোঁ রুঢ় কণ্ঠে জোর গলায় বলে উঠলেন,- ”হামরা কি মানুষ না কুইত্তা জানোয়ার”? হামার ছরীল (শরীর) কাঁটলে যে অক্ত বাইর হবে, তোমহারা ছরীল কাঁটলে একই অক্ত বাইর হবে। তবে হামরাগুলার সাথে এ্যামন ব্যবহার করা হয় ক্যান?…ক্যান?।”
হায়রে সমাজ! সভ্যতা। এই সভ্য জগতের সভ্য মানুষ আমরা আর কত আধুনিক, বিজ্ঞান মনস্ক যৌক্তিক মানুষ হলে এই হরিজনদের ভালোবাসতে পারব। শ্রদ্ধা করতে পারব। পারব দিতে সমধিকার। এরই মধ্যে আমাদের দেখে এগিয়ে এসেছেন একই গোত্রের পাশের বাড়ির শিলা। স্বামী রণজিত নারকেল গাছ থেকে পড়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন। মন বেশি ভাল নেই শিলার। তবুও অভিযোগ। দুই ছেলে জয় ও অজয়। অজয় কারমাইকেল কলেজের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। অজয় হরিজন পরিবারের সন্তান বলে অনেকেই তার সাথে মিশতে চায় না। এক সাথে বসতে চায় না। শিক্ষকরা তাকে প্রাইভেট পড়ান না। হোম টিউটর পাওয়া যায় না। সে কারণে গত পরীক্ষায় অজয় একটি বিষয়ে ফেল করেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করবে বলে জানিয়েছে। এ নিয়ে শিলার যেন দুঃচিন্তার অন্ত নেই।
এখানে তিনটি হরিজন পরিবারে ১০-১২ জন সদস্য বসবাস করেন। এরই মধ্যে বিধবা নারী দুলি তিনিও খুলেছেন অভিযোগের বুলি। তারা ভেবেছেন আমরা বুঝি সমস্যা সমাধানকারী। তাই আমাদের ঘিরে ধরে হড়-হড় করে সবাই সমস্যা, সম্ভাবনা,লাঞ্ছনা-বঞ্চনা আর বৈষম্যমূলক আচরণের কথা বলে গেলেন। কিন্তু তারা তো জানেন না যে , বিশাল সিন্ধুর মত পৃথিবীতে একবিন্দু সাহায্য করার সামর্থ্য আমাদের নেই। যুগ-যুগ ধরে অনেক পত্রিকায় এই রাধিকাদের নিয়ে অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখা হয়েছে। কিন্তু তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি। আমি জানি আমার এ লেখায় কারো তিলার্ধ টনক নড়বে না। রাধিকার আক্ষেপের সুর চুল পরিমাণ হেরফের হবে না। তা সত্ত্বেও রাধিকাদের নিয়ে যে অহেতুক রসিকতা করলাম। কাজের কাজ কিছুই করতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা কর রাধিকা…! ক্ষমা কর ……!






আসলেই উঁচু নিচু জাতপাতের জাল আমরা এখনো ছিড়তে পারিনি। অল্প কিছু মানুষ সারা জীবন এসব নিয়ে চিৎকার চেচামেচি করে । কিন্তু কোন লাভ হয় না। কেউ কেউ ওদের নিয়ে দোকানদারি করে। এমন ভাব ধরে যেন এবার উদ্ধার করেই ছাড়বে। সুন্দর নামে ডাকে “ পিছিয়ে পড়া” কিন্তু সে ওই পর্যন্তই। দোকানদারি শেষ তো আর কারো দেখা নেই। কিন্তু বিষয়টি যে খুব কঠিন তা নয়। একটা মানষিক সংকট কাটিয়ে ওঠা এই তো ? খুব সহজ। গণমাধ্যমগুলো এক যোগে এর কুফল প্রচার করলেই পারে।আমরা পরিবার পরিকল্পনায় সফল হইনি ?