Home » অন্যান্য » সদা সত্য কথা বলতে মানা !!!

সদা সত্য কথা বলতে মানা !!!

358 বার পঠিত

ছেলেবেলায় ঘুমানোর সময় গল্প না শুনলে যেন ঘুমই আসত না। তাই কাল্পনিক রাক্ষস খোক্কসের গল্প শুনে ঘুমের ঘোরে, ভয়ে কতবার যে মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গেছে তার ইয়ত্তা নেই। মাঝে মাঝে ভাবি কত রকমারি ও ভয়ানক বাহারি গল্পের সমাহার ছিল মা বোন ভাইদের ঝুলিতে। আমি অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে বড় হয়েছি। আমার জীবনে গোলা ভরা ধান চোখে না দেখলেও, পুকুর ভরা মাছ দেখেছি। মাঠের পর মাঠ সবুজ ক্ষেত দেখেছি। সে ক্ষেতে রকমারি শাঁক সবজি দেখেছি। নাগরিক জীবন অথবা শহুরে, কোন জীবনেই অন্তত মাছ আর শাঁক সবজির অভাব দেখিনি। আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি। তাঁরা নিশ্চয়ই দেখেছি যে, গ্রামের হাঁটে কেও কোন সবজি বিক্রি করতে না পারলে, তা আর বাড়িতে ফিরিয়ে নিত না। রাস্তার পাশে ফেলে দিত। অথবা বিনে পয়সায় কাওকে দিয়ে দিত। অনেকে হয়ত সেই পুরনো দিনের গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের কথা স্বীকার করেন না। কিন্তু আজ সে বিতর্কে না গিয়ে অন্য একটি বিষয়ে দৃষ্টি দেয়ার জন্য লেখতে বসেছি।

মাঝে মাঝে ভাবি শুধু শুধু লিখে কি হবে। এই যে এতসব লেখা লেখি কি উপকার হচ্ছে সমাজের। তাই মনটা ভেঙ্গে যায়, বিষণ্ণতায় চেপে ধরে। আর লিখতে ইচ্ছে জাগে না। কিন্তু জানিনা কিসের টানে, কোন দায় বদ্ধতায়। আবার লিখতে বসে যাই। না লিখলে ভাল লাগে না। অনেক দূরে আছি দেশের প্রতি কিছু করছি, ডলার পাঠাচ্ছি। আর কি চাই? এই ভাবনা নিজেকে সন্তুষ্ট করতে পারে না।

আজ দেশের যা অবস্থা হয়েছে। কোন সমস্যার কথাটা আগে লিখব। কোন সমস্যার সমাধানের ব্যাপারেই বা আগে মতামত দিব। তা বুঝে উঠতে পারছি না। ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, সমাজ কর্মী, অথবা পুলিশ। না কি মন্ত্রী, সরকারি আমলা নাকি সাধারণ জনগণ, কাদের কথা আগে বলব। একটি আদর্শ দেশ গড়তে হলে সবার অংশগ্রহণ জরুরি। এই যে কথাটা এটা কি আমাদের রাজনীতিবিদ, প্রশাসন অথবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় নিয়োজিতরা জানেন না? অবশ্যই জানেন। এই যে সাধারণ জনগণের মাঝে সীমাহীন অসন্তোষ, নিজেদের মাঝে সহনশীলতার অভাব। এটা কি আমরা বুঝি না? অবশ্যই বুঝি। এই যে রাজনীতিবিদরা বেপরোয়া হয়ে গেছেন। এটা কি তাঁরা বুঝেন না? আমি তো বলব, অবশ্যই বুঝেন। তাহলে আমাদের সমস্যাগুলো কোথায়? এর উত্তর কি আমাদের জানা নেই? আমি বলব না, আমাদের অনেকেরই এর উত্তর জানা নেই।

এই তো কিছু দিন আগে প্রথমআলোতে, জনাব আনিসুল হক সাহেবের প্রাণ ছোঁয়া একটি লেখা পড়লাম। জানলাম, দেশের সাধারণ মানুষরা আজও কতটুকু দায়িত্ববান। পরের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা বোধ করেন না। এই তো কিছু দিন আগে একটি ক্রিকেট খেলা পুরো দেশটাকে একটি প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছিল। এই তো সেদিন দেখলাম একজন রিকশাওয়ালা তাঁর সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল বানিয়ে, জাতিকে কাঁদিয়েছিল। এই তো সেদিন দেখলাম……কতই তো দেখি। কই আমাদের সরকার, রাজনীতিবিদ আর উপর ওয়ালাদের ঘুম তো ভাঙ্গে না। আর কত উদাহরণ দিতে হবে। এই তো সেদিন নুর হোসেন গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিলেন। এই তো সেদিন লাখও শহীদের জীবনের দামে ফিরে পেলাম স্বাধীন দেশ। এই তো সেদিন সালাম বরকতরা ভাষার জন্য জীবন দান করলেন। সে তাজা রক্তের দাগ আজও পিচ ঢালা পথ থেকে শুকিয়ে যায়নি। তাহলে আর কত রক্ত ঝরালে এ জাতি পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ পাবে। আর কত……?

একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি বলে আমরা যা ইচ্ছা তাই করব। পুলিশের উপর দিয়ে গাড়ি উঠিয়ে দিব। অথবা ক্রস ফায়ারে বিনা বিচারে মানুষ মেরে ফেলব। অথবা মন চাইল আর শেয়ার বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পার পেয়ে যাব। আমরা এ দেশটা কি স্বামীহারা অথবা পিতৃহারা দুই পরিবারের কাছে ইজারা দিয়েছি? যে, তাঁরা যা করবে তাই আমাদের চোখ বুজে মেনে নিতে হবে? দেশটা কি আওয়ামীলীগ আর বিএনপির টাকায় কেনা তাঁদের পারিবারিক সাম্রাজ্য? যে আমাদের কথা বলতে দেয়া হবে না। যারা অন্যায় অত্যাচার করে তাঁদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলা যাবে না? এ জন্যই কি আমরা এ দেশটাকে পাক হায়েনাদের কাছ থেকে মুক্ত করেছি? মুক্ত দেশে অসহায় মানুষগুলো দু মুঠো খাবারের জন্য কেন উপর ওয়ালাদের দিকে চেয়ে থাকতে হবে? আর উপর ওয়ালারা বস্তা বস্তা টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করে দিবে। আর এর বিরুদ্ধে যে কথা বলবে তার জিব টেনে ছিড়ে ফেলবে। অথবা গুম করে দিবে। আর কত অত্যাচার করবে আমাদের, আর কত?

সবচেয়ে কষ্ট লাগে যখন দেখি একচক্ষুনীতির বুদ্ধিজীবীরা মোটা কালো ফ্রেমের চশমায় কোন অন্যায় দেখতে পায় না। নিজের স্বার্থের জন্য বিদ্যাটা বিকিয়ে দেয় বাজারে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের দেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র বাজারের নর্তকী অথবা বেশ্যার চেয়ে খারাপ। রঙ ঢঙ্গ দেখে তো বেশ্যাকে চেনা যায়। কিন্তু খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মোটা ফ্রেমের চশমা, আদ্যি-সুতি পাঞ্জাবীর আড়ালে এই বুদ্ধিজীবীদের কি করে চিনব। সেই যে একটা গান আছে না। ডোরা কাঁটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়/ বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়/ মুখ ঢাকা মুখোসের এই দুনিয়ায়/ মানুষকে কি করে চিনব বল? সত্যি আজ প্রাণের মানুষ চেনা বড় দায়। এ ক্ষেত্রে গানটা একটু মডিফাই করতে হবে। বলতে হবে, ‘মুখ ঢাকা মুখোসের এই বাংলায়/ বুদ্ধিজীবীদের কি করে চিনব বল’?

ছেলেবেলার রাক্ষস খোক্কসের গল্পের ছলে লেখেটা শুরু করেছিলাম। ভাবতেই পারিনি লেখাটার রূপ এমন হবে। বর্তমান বাংলার চেহারা এমনই অনিশ্চিত হয়েছে। আজ যেন মা তাঁর সন্তানকে রাক্ষস খোক্কসের গল্পে ঘুম  পারাতে হয় না। আজ  আমাদের প্রতিবেশীরাই যেন  রাক্ষস খোক্কসে পরিণত হয়েছে। আর দেশের এই অধঃপতনের দায় সরকার, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, প্রশাসন সবাইকেই নিতে হবে। আজ শুধু গোলা ভরা ধান, আর পুকুর ভরা মাছ এই দেশ থেকে হারিয়ে যায়নি। আজ যেন আমরা আমাদের পুরনো বাংলার সবুজ দেশটাকে, মাটির মানুষগুলোকে হারাতে বসেছি। আজ যেন সত্য কথাটা বলতেও ভুলে গেছি। ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ ছেলেবেলার সেই পাঠশালায় শেখা বচনও মডিফাই হয়ে গেছে, সদা সত্য কথা বলতে মানা।

 

সাঈদ মোহাম্মদ ভাই

saeedmbai@hotmail.com

মন্তব্য
  • মিজান আব্দুর রশিদ এপ্রিল 12, 2012 at 10:37 অপরাহ্ন

    ভাই,আপনার লেখাটা পড়ে আমি অভিভূত হয়েছি।আপনার ভাবনার গভীরতাই আমি মুগ্ধ।আপনার মতো করে যদি আমাদের রাজনীতিবিদেরা ভাবতেন তাহলে আজ আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতাম।আসলে তারা দেশের জন্য রাজনীতি করেনা।রাজনীতি করে নিজের জন্য,নিজের পকেটের স্বাস্থ্য ভালো করার জন্য।এই খায় খায় নীতি থেকে আমরা কবে মুক্ত হব জানিনা…

    • সাঈদ মোহাম্মদ ভাই এপ্রিল 13, 2012 at 7:04 পূর্বাহ্ন

      ভাই মিজান রশিদ আপনার চমৎকার মতামত প্রদানে নিজেকে সম্মানিত মনে করছি। বিনীত ভাবে, কৃতজ্ঞচিত্তে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই।

      আমি তো মনে করি বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষই আমার মত করে ভাবে। অনলাইন পত্রিকায় পাঠকের মন্তব্য পড়লেই বুঝা যায়। এক একটা মানুষ কতটুকু ভালবাসে দেশটাকে। নিজের সামর্থ্যের বাহিরে গন-মানুষেরা কীইবা করতে পারেন। যুগের পর যুগ আমজনতাই তো দেশের টানে জীবন দিয়েছেন। কই কয়জন রাজনীতিবিদের জীবন যায় দেশ গড়ার কাজে, অন্যায় প্রতিরোধে। রাজনীতিতে যাদের জীবন দেয় তাঁরা তো দেশ ধ্বংসের মিছিলে জীবন ক্ষয় করে। একটা রাক্ষসের মৃত্যু হয়। দেশ প্রেমিকের নয়।

      এই ভয়ঙ্কর রূপ থেকে দেশ কবে মুক্ত হবে জানি না। অনেক দূরে থেকে মাঝে মাঝে মনে হয় অনেক ভাল আছি। কিন্তু এই স্বার্থ পড়তায় ভাল থাকা আর ভাল লাগে না। দেশটা মুক্ত করতে সবার জাগ্রত হওয়া দরকার। দেশটা এখন বিষ দংশনে কাতর ঘুমিয়ে। একটু চিকিৎসার দরকার। চলুন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশটাকে আবার লাল সবুজের দেশে পরিণত করতে সহায়তা করি।

© বদলে যাও বদলে দাও