Home » অন্যান্য » হরতাল ও আরো কিছু

হরতাল ও আরো কিছু

241 বার পঠিত

১.

মহাসমারোহে হরতাল আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসছে । ভাবতে ভালই লাগছে । কিছু দিন আগে হরতাল ডেকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে বিরোধী দল অনেকের মন ভেঙ্গেছিল বোধ করি । তাদের ভাঙ্গা মন আবার জোড়া লাগতে যাচ্ছে । হয়তো তারা প্রবল উৎসাহে শান দিতে বসে গেছে । আবার একটি দিন আসছে নিজের করে নেয়ার জন্য । এবার হয়তো আর ফিরে যেতে হবেনা বিষণ্ণ বদনে । ধন্যবাদের মত হরতালের কি ফিরে যাওয়া উচিত ? ধন্যবাদ তো দেওয়া হয়েছিল গুটিকয়েক মানুষকে আর হরতাল সারা দেশের জন্য, জাতির জন্য ।

২.

যাই হোক, হরতাল আবার ফিরে আসছে । আমার মত হয়তো দুই কি একজন পাওয়া যাবে যারা আগামী রবিবার হরতাল শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন, “যাক বাঁচা গেল, একদিন ছুটি, ক্লাসে যেতে হবেনা” । হয়তো দশ-বারো বা পনেরো জন পাওয়া যাবে যাদের এ নিয়ে কোন কিছু আর বলার নেই । বলতে বলতে, দেখতে দেখতে ক্লান্ত এখন । পরিস্থিতি যাই হোক জীবনটাকে শুধু টেনে নিতে পারলেই হল । আর বাদবাকি আশি জন? আজ হোক আর কাল হোক, যে কোন কালেই যারা হরতাল কে না বলে এসেছে । দিনের আহার দিনেই যোগার করতে হবে যার সে কি করবে? অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য? সব কি বন্ধ থাকবে? আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারবে সাধারণ মানুষের জান-মালের? না তারা ব্যস্ত থাকবে পিকেটারদের শায়েস্তা করতে?

হ্যাঁ, পরাধীনতার কালে হরতাল ছিল প্রতিবাদের মোক্ষম হাতিয়ার । এখনো হরতাল অনেক দেশে ব্যবহৃত হয় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে । সবচেয়ে সেরা হাতিয়ার সবসময় ব্যবহার করলে তার কার্যকারিতা নষ্ট হতে বাধ্য । সেই সেরা হাতিয়ার ইতোমধ্যেই জীবন সায়াহ্নে, যার কোন স্ক্র্যাপ ভ্যালুও নেই ।

৩.

আমাদের দেশের অনেক বড় একটি অসুখ করেছে । দিনকে দিন বেড়েই চলেছে । গাড়ি ভাংচুর । ছাত্রদের দু দলে কিছু হয়েছে? রাস্তায় নামো, বাস ভাঙ্গ । মালিক দাবী মানছে না? রাস্তায় চলো- গাড়ি ভাঙ্গ । গাড়ি চাপা পড়েছে কেউ? আবার নামো রাস্তায় । মিছিল-মিটিঙে পুলিশের বাঁধা? আর কি করার আছে গাড়ি ভাংচুর করা ছাড়া? এত অবলীলায় বোধ করি আর কোন দেশে এই উদ্ভট কাণ্ড ঘটেনা । যারা কাজটি ঘটাচ্ছে তারা কি বোঝে না? উত্তর হল- কোন শিশুকে গাড়ি ভাঙ্গতে দেখিনি, শুনিনি । যারা করছে জেনে-বুঝেই করছে । জেনেশুনে নিজের পায়ে কুড়াল একমাত্র মানুষই মারতে পারে । আমরা অনেক অনেক খারাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে দিনাতিপাত করি । অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভাল কিছু যেন আসে সেটা চাই, খারাপ জিনিসকে বারবার অনুশীলন আমাদের ভাল কিছু তো দেয়ই না বরং সকল ভাল কে ব্ল্যাক হোলের মত গ্রাস করে ফেলে ।

রবিবারের হরতালের যোগসূত্রে কোন গাড়ি ভাংচুর হবেনা, কোন গাড়িতে আগুন দেয়া হবেনা, চাওয়াটা কি খুব বেশি?

৪.

দেশের সাবেক একজন সাংসদ শহরের নিরাপদ-তম এলাকা থেকে নিখোঁজ । খুন হলেন এক মা তার নিজ বাসায় । তারও আগে একই জায়গায় খুন হলেন বিদেশী কূটনীতিক । সাংবাদিক দম্পতি খুন হয়েছেন নিজ বাসায় । এসব ঘটনার তদন্ত? “হচ্ছে । সময় হলেই অগ্রগতি জানানো হবে” । অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে জানিনা তবে অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা বাড়ছে বলেই দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে । বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো একতাবদ্ধ হয়ে দেশের সার্বিক নিরাপত্তায় বড় আকারে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলিয়ে দিচ্ছে । দেশের মানুষ সরকারের কাছে বেডরুম নিরাপত্তা চায় না, জিজ্ঞেস করে দেখুন সবাইকে । এই একের পর এক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সকল সময়ের চেয়ে ভাল আছে বলাটা যুক্তিযুক্ত যে নয় এটা বোঝার জন্য বোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন নেই । পাগল বা শিশুও নিজের ভাল বোঝে ।

 

 

কড়িকাঠুড়ে

২০.০৪.২০১২

মন্তব্য
  • Mir Abdul Alim এপ্রিল 22, 2012 at 11:59 পূর্বাহ্ন

    মীর আব্দুল আলীম :
    ক্ষমতায় থাকলে হরতাল চাননা; ক্ষমতায় না থাকলে চান। রাষ্ট্রের অতীদায়িত্বশীল প্রধান দল গুলোর এমন ভুমিকায় দেশের আমজনতাকে কতটাইনা হতাশ হতে হয়। এ অবস্থায় রাজনৈতিক দল গুলোর উপর কতটা আস্থা রাখতে পারি আমরা। জনগণের চোখে তাদের ভাবমূর্তিরইবা অবশিষ্ট কি থাকে ? কারণে-অকারণে হরতাল হোক, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক-এমনটি কেউ চায় না। হরতাল হলে শ্রমঘণ্টার অপচয় হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয়, অর্থনীতির ক্ষতি হয় । তাই বলে দেশের কোন রাজনৈতিক দল হরতাল ডেকেছে বলে ঢালাওভাবে বিষোদগার করতে হবে, তাদেও পিছু নিতে হবে তাও কিন্তু ঠিক নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি গণতান্ত্রিকও নয়। সরকারে থাকলে হরতাল অন্যায় কাজ, বিরোধী দলে গেলে এটি গণতান্ত্রিক অধিকার যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ট্র্যাডিশান হিসেবে চালু আছে। হরতাল নিয়ে দোষা দোষীতে দেশের বারটা যে বেজে যাচ্ছে তার খবর কে রাখে? বিষয়টি এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো আর কতোকাল পরে উপলব্ধি করবে? আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল গুলো দু’পক্ষই সরকারে থাকলে এক রকম আচরণ করেন, সরকারের বাইরে গেলে করেন বিপরীত আচরণ । সরকারে থাকলে তারা হরতালের বিরুদ্ধে থাকেন। তখন তারা বুঝতে পারেন যে, হরতালে দেশের ক্ষতি হয়, প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। বিরোধী দলকে এসব বিষয়ে জ্ঞান দান করতে থাকেন। তারা এর পরে বিরোধী দলে গেলেও আর হরতাল ডাকবেন না, এ মর্মে প্রতিশ্রুতিও দিতে থাকেন, সে প্রতিশ্রুতি কখনো পালিত হয় না। কেউ কথা রেখেনা। প্রকৃত পক্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই গত দুই দশক ধরে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসাবে হরতালকে ব্যবহার করে আসছে।
    হরতাল মানেই ভাংচুর জ্বালাও পোড়াও। হরতাল সফল করতে আমাদের রাজনৈতিক দল গুলো এমনই সমভাব হরতালের ক্ষেত্রে। হরতালে এভাবে গাড়ী ভাংচুর করবে কেন? কার গাড়ী? কে ভাংগে ? কেন ভাংগে? কেন হরতাল সফল হয়, কিভাবে হয় তা আর সাধারণ মানুষের জানতে বাকি নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ যেটা জানে না তা হলো, কর্মনাশা হরতাল আদৌ কি তাদের কোন স্বার্থ রক্ষা করতে পারে? সমস্যা সমস্যার জায়গাতেই থাকে। বরং হরতাল সমস্যাটাকে আরও ঘনীভূত করে; আরও প্রকট করে। নিছক ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে, এক দলকে হটিয়ে আরেক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশব্যাপী হরতাল ডেকে জনগণকে তাদের স্বাভাবিক কাজ-কর্ম থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা সংবিধানে প্রদত্ত ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’-এর পর্যায়ে পড়ে না। এতে হরতাল আহবানকারীদের কথিত ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’-এর নামে বাদবাকি জনগণের ‘গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার’ হরণ করা হয়। বস্তুত আমাদের দেশে এখন যে ধরনের হরতাল হয় এবং সে হরতাল যেভাবে ‘সফল’ হয়, তা রাজনৈতিক সন্ত্রাস ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের দেশে যে কোনো বড় রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রচারণার জন্য হরতালই হচ্ছে ‘সবচেয়ে সহজ’ কর্মসূচি। মুক্তাঙ্গনের মতো ছোট জায়গায় সভা করতে গেলেও কিছু প্রস্তুতি দরকার হয়। স্টেজ বানাতে হয়, মাইক বাঁধতে হয়, কিছু লোক সমাগম প্রয়োজন হয়। নেতা-নেত্রীদেরও উপস্থিত হতে হয়। কিন্তু হরতালে এর কিছুরই দরকার হয় না। কেবল ঘোষণা দেওয়া। অতঃপর হরতাল ঠেকাবার জন্য সরকার ও সরকারি দলের তৎপরতাই হরতাল সফল করার জন্য যথেষ্ট। হরতাল ঘোষণাকারী নেতা-নেত্রীরা যার যার বাড়িতে বসে থাকলেও হরতাল হয়ে যেতে পারে। বড় দল তো বটেই, মাঝারি ধরনের জনসমর্থন আছে এমন দলের পক্ষ থেকে হরতাল ডাকা হলেও তা ‘সফল’ হতে পারে। আর এ হরতাল আমাদের কতটুকু কল্যান বয়ে আনছে ? অন্তত দেশের কল্যানে তা আমাদেও রজনৈতিক দল গুলোকে আজে ভাবতে হবে। গণতন্ত্রে সুস্থ রাজনীতির বিকল্প নেই। সরকারে থাকা কালীন সময় “হরতাল করবনা” বিরোধী দলে গেলে “হরতাল করব” এমন দৈত্বনীতি পরিহার করতে হবে। হরতালের ব্যাপারে সুুনদুষ্ট ছক তৈরি করতে হবে। আমাদের রাজনীতিবিদদের হরতালের বিষয়ে ঐক্যমত হতে হবে । বলা হয়ে থাকে হরতাল ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ । আর এ অধিকারের নামে যেন দেশের অমঙ্গল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অগত্যা হরতাল করতে বাধ্য হলে জনস্বার্থেও প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। হরতালের বিষয়ে দুই নেত্রীর জনগনকে দেয়া ওয়াদা যেন ঠিক থাকে এটাই সকলের প্রত্যাশা।
    (লেখক : লায়ন মীর আব্দুল আলীম, এখলাছ গ্র“প অফ ইন্ডাষ্ট্রিজের নির্বাহী পরিচালক, ৩০/৩১ বিসিআইসি ভবন (১৭ তলা), দিলকুশা বা/এ, ঢাকা-১০০০। হবংিংঃড়ৎব০৯@মসধরষ.পড়স )

© বদলে যাও, বদলে দাও!