Home » অন্যান্য » কিছু গুণ ও আমাদের অনুরাগ

কিছু গুণ ও আমাদের অনুরাগ

233 বার পঠিত

কিছু গুন ও আমাদের অনুরাগ

আসিফ ইকবাল

আমরা সবাই টাটকা জিনিস পছন্দ করি এটা অতি বাস্তব, টাটকা জিনিসের প্রতি সবারই দুর্বলতা রয়েছে । সবাই জানি টাটকা তরতাজা শাকসবজি শরীর ও মনের জন্য বড্ড উপকারী । শাক সবজি ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করার পর বেশ কিছু সময় প্রকৃতিগত কারনেই তরতাজা থাকে তবে তা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসতে আসতে সেটার গুনগত মান কমতে থাকে এর জন্য সবজি বিক্রেতারা কিছু পন্থা ও বেঁছে নেন । সেগুলো আমাদের সওয়া হয়ে গেছে, সেগুলো অনেকটাই আমরা বুঝতে পারিনা, তাই সেগুলো নিয়ে কোথাও উচ্চবাচ্য হয়না। কিন্তু যেগুলো আমরা বুঝতে পারি সেগুলো নিয়ে কি করি ? আমাদের ভেতর কেউ কেউ আছেন যারা অতিশয় টাটকা জিনিসের প্রতি তীব্র ব্যাকুল। তেমনটি দেখলাম একদিন বাজার করতে গিয়ে একজন ভদ্রলোক তেল মারা টমেটো খুজছেন সেটি অবশ্য পরে বুঝলাম ভদ্রলোক ও বিক্রেতার কথোপকথনে “তোমার টমেটো চকচকে না ক্যান, চেহারা না ভালো হইলে জিনিস খাইতে ইচ্ছে করে ? যত্তসব ফালতু …” তবে অন্য আর একদিন এক ভদ্রমহিলাকে পেলাম যিনি তেল ছাড়া টমেটো খুজছেন ব্রিক্রেতাকে বলছেন “তোমার টমেটো তেলতেলে ক্যান, তেল দিছ ? তেল দিবানা “ এবার ব্রিক্রেতার উত্তরতা হল “ তেল ছাড়া পাবলিক খায়না “ আমরা ভেজালবিরোধী আন্দোলনে নেমেছি অথচ কিছু গুনের প্রতি আমাদের বেশ অনুরাগ রয়েছে সে গুন গুলো যেমন চকচকে,তেলতেলে, ধবধবে, ফকফকে সাদা , লাল রাঙা ইত্যাদি । তো বিক্রেতা বেচারা কি করতে পারে ? কিছুদিন বাদে দেখি সে দুপ্রকার টমেটো রাখা শুরু করেছে একটা তেল মারা আর একটা তেল ছাড়া তবে তেল মারাটার দাম একটু বেশি ধরা হয়েছে ।

বেশ কিছু বছর আগের কথা আমি তখন ঢাকায় সবে এসেছি, মা প্রতিবার বাড়ী থেকে ফেরবার সময় বেশ কিছু খাবার যেমন চিড়া, মুড়ি, গুড় সাথে করে দিয়ে দেন সেবার ও দিয়েছেন যাতে সকালবেলাটা অন্তত পেটটা ঠাণ্ডা রাখতে পারি মার কথা । সকাল বেলাটা সেগুলো দিয়েই চালাই বুয়ার কোন ঠিকঠিকানা নাই, কোনএকদিন দিন মেসের এক বড়ভাই রুমে আসলেন উনাকে বাড়ী থেকে গুড় মুড়ি দিয়ে আপ্যায়ন করি । তিনি বেশ অবাক হন যেটা বলেন সেটা হল আমার মুড়ি সাদা না ,শক্ত চিবোতে কষ্ট হয়, আর গুড়টা দেখতে কালো । আমি তাকে বোঝাই এগুলো আমি বাড়ী থেকে এনেছি এতে বিষাক্ত ইউরিয়া নেই। কিন্তু তিনি বুঝতে নারাজ মোদ্দা কথা আমার গুড় ও মুড়ি ভালো নয় । কিছুদিন পর ঐ বড়ভাইয়ের ফকফকা সাদা মুড়ি ও গুঁড়ের সাথে পরিচিত হই ।

গত রমজান মাসে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস লিখলাম “ চিনির বিকল্প দেশি গুড় ব্যাবহার করুন “ ভাবলাম চিনির দামটা অকল্পনীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে কষ্টটা সমসাময়িক অনেকই হয়তো লাইক করবেন কমেনটস করবেন । আমরা যদি সংঘবদ্ধ হই, একী চেতনাই উদ্বুদ্ধ হই চিনির ব্যবহার কমিয়ে দেই তাহলে মজুতদাররা চিনির দাম কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে । কিন্তু কি হোল ? কোথাও কোন কমেনটস পড়লনা একটা লাইক ও না । হতাশ আমি বাজারে যেয়ে ঘুরি, দেখি মানুষ দেদারসে চিনি কিনছে মানুষের এখন টাকার অভাব নেই আগে বাজারে যেত থলে হাতে এখন যায় ট্রলি ঠেলে । ট্রলি ঠেলাতে আমার আপত্তি নেই মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি অবশ্যই ঝক্কিঝামেলা ছাড়া পেতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু এখানকার অথবা এখনকার মানুষেরা ভুলে যাচ্ছে চিনির প্যাকেটের গায় একটা দাম লেখা থাকে সেদিকে তাকাতেও । ফলে প্রমানিত হচ্ছে ভোক্তার ভোগের কমতি নেই সেখানে দ্রব্যমূল্য যেটাই হোক । সমস্যার পড়েছে সেইসব মানুষেরা যারা ট্রলি ঠেলতে পারেনা বাজারে যেতে হয় যাদের থলে হাতে করে তাদের থলের ভেতর বেড়াল নেই যে কাড়ি কাড়ি টাকা প্রসব করে যাবে নিয়মিত ।তাদেরকে পড়তে হয় বিড়ম্বনায় দোকানদারের সাথে রফারফি শুরু হয় মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়া শুরু । এদিকে মজুতদারের মজুত দ্রব্য বিক্রি হচ্ছে স্বাভাবিক হার থেকে আরও বেশি তাই তাদের অতি অল্পকষ্টে অধিকহারে দিন দিন উঠতি মুনাফা আরও বাড়তে থাকে। তাদের আনন্দের সীমা নাই । মজুতদার তার চেয়ারে হেলান দিয়ে পান চিবিয়ে লালঠোট আরও রাঙা করে গুন গুন করে গান গেয়ে যায় “ আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে … “ ।

অবশেষে চিনির রঙ হারানোর কথা বলে শেষ করি আজই কাগজে পড়লাম লালচে হওয়ায় বাজার পাচ্ছেনা আমাদের দেশি একটি কোম্পানির চিনি । ফলে চিনিটা দীর্ঘদিন ধরে মিলের সংরক্ষণঘরে পড়ে থাকবে, নষ্ট হবে, পচবে তবু বিক্রি হবেনা ।যতোদূর জানি লালচিনি দেশি আখের মাড়াই করা রস থেকে উৎপাদিত এবং এ চিনি অন্যান্য বিদেশি চিনির চেয়ে উৎকৃষ্ট এতে কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু পাবলিক খায়না, পাবলিক কারা ? আমরা সাধারন জনগন। আমরা সাধারন জনগণ আমদানি করা সাদা চিনি খাই সেটা এখনকার লবনের চেয়েও মিহি করা পানির মধ্যে ঢেলে দিলে গলতে সময় লাগেনা, মুখে দিলে কথাই নাই কোন কষ্ট হয়না মিঠাইয়ের স্বাদ নিতে। ফলটা কি হচ্ছে, আমরা সবাই জানি অনেকে উপলব্ধিও করে কিন্তু অভ্যাস সেটা সাহেবি বদলাবার নয় । আমরা নিজেদের জাতিসত্তা সংস্কৃতি নিয়ে খুব বড়াই করি, একজনের সাথে লাগলে ছেড়ে কথা কইনা অথচ আমাদের জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম কোথায় নেমেছে চিন্তা করলে মাথা নিচু হয় বৈকি উচু হয়না ।

বদলে যেতে কি দরকার ? প্রত্যেকটা মানুষের হৃদয় বদলাক তার কর্মে প্রতিফলিত হোক সে দেশপ্রেমিক তার জাতীয়তাবোধ তীব্র । তারপর একটা পরিবার বদলাবে, তারপর একটা সমাজ, সেই সমাজের বদলে যাওয়া পরিবারগুলিকে নিয়ে একদিন রাষ্ট্র বদলাবে ।

email : asif_iqbal_07@yahoo.com

মন্তব্য
  • ফারজানা নাজনীন এপ্রিল 24, 2012 at 1:52 অপরাহ্ন

    সত্যই ভেজাল ছেয়ে গেছে অথবা চড়া দামে কেনার সামর্থ্য হারাচ্ছি ! বাজারে গেলাম !! জীবিত মাছ পেলাম !! তার মানে মাছে বিষাক্ত ফমালিন নাই। যেই দাম জিজ্ঞাসা করি , দাম শুনে মাথা নিচু করে ফিরে আসতে হয় খালি হাতে। কি করব? বিষাক্ত ফল কিনব? মাছ কিনব ? নাকি না খেয়ে থাকব? টমেটোতে তেল মানেই তাজা এটা সব সময় ঠিক না। কারন আমি নিজেও বাজার করি আমি জানি বাজারের দূরাবস্থা !! চিনির বদলে গুড় খাবেন ? গুড় কিভাবে বানায় দেখেছেন ? দেখলে তো পালাবেন…বলেন মষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়াই ছেড়ে দিলাম আজ থেকে !!

    • dearsumon এপ্রিল 24, 2012 at 2:37 অপরাহ্ন

      আপনি যা বলেছেন তা অতি বাস্তব । মনে হয় দিনদিন কিছু মানুষ যারা জোট বেধে গোষ্ঠী হয়ে উঠছে তাদের কাছে আমরা সাধারনরা কিন্তু অগনিত জিম্মি হয়ে যাচ্ছি, স্বাধীনদেশে কেমন যেন নিজের দেশের কিছু মানুষের অধীন হয়ে যাচ্ছি । এদের নীতি নৈতিকতার প্রচণ্ড অবক্ষয় ঘটে যাচ্ছে কত নিচে নামতে পারে এরা স্বয়ং খোদাতায়ালা ও জানেননা বোধ হয় !! ।

  • dearsumon এপ্রিল 23, 2012 at 10:43 অপরাহ্ন

    বুঝলামনা ! আমার লেখাটা সমসাময়িক না হওয়াতে অথবা এই উত্তাপের ভেতর কেউ একজন ও মন্তব্য করলেননা। অথচও এটা অনেকেই পড়েছেন এ জন্য ধন্য মনে করছি নিজেকে। ব্লগ সঞ্চালকের প্রতি বিনীত অনুরধ রাখছি লেখাটাকে sticky করার জন্য, হয়তো লেখাটা আরও অনেকে পড়বেন এবং তাদের জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করবেন ।

© বদলে যাও বদলে দাও