Home » অন্যান্য » আমার এক সহব্লগারের পোষ্টে লেখা মন্তব্য!

আমার এক সহব্লগারের পোষ্টে লেখা মন্তব্য!

288 বার পঠিত

বদলে যাও বদলে দাও মিছিল-এর সহব্লগার সাআখান তার “হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর খোঁজ চাই, মিথ্যে শুনতে চাইনা” শিরনামে তার তিন/চার বয়সে মেলায় হারিয়ে যাওয়ার একটি ঘটনা লিখেছেন। তারপর মেলা সংশ্লিস্ট একটি মসজিদের মাইকের ঘোষনায় কিভাবে তাকে ফিরে পাওয়া গেলো তার বিবরন দিয়েছেন! পাশাপাশি সেই আপনজন হারানোর কি দুঃসহ বেদনা তার আকুতি থেকেই বর্তমান সরকারের প্রতি আবেদন করেছেন সব নিখোজ ব্যক্তিদের খোঁজ বের করে দেবার জন্য। নিঃসন্দেহে এটি একটি সুন্দর ও সময়উপযোগী লেখা। লেখাটি পড়ে আমি একটু বেশিই আবেগপ্রবন হয়ে পড়েছিলাম ও তাকে একটি লম্বা-চওড়া মন্তব্য লিখেছিলাম, যেটা আমার মনে হয়েছে পাঠককুলের সাথে শেয়ার করি।

[“ধন্যবাদ ভাই সাআখান, অত্যন্ত সুন্দর ও সময় উপযোগী লেখা পোষ্ট করার জন্য। আমার মনে হয় পরম করুনাময় আল্লাহ তায়ালার কাছে আপনি শুকরিয়া আদায় করুন যে, আপনি সেই সময় হারিয়েছিলেন(আপনার প্রফাইল/পূর্বাতন লেখা থেকে অনুমান করছি আপনার বয়স ৩০-৪০ এর মধ্যে হবে)। বর্তমানে জন্মালে এবং হারালে মাইকিং এর মাধ্যমে আপনাকে পাবার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি ছিল এবং এটা নিয়ে প্রতিহিংসা পরায়ন দু-দলের একে অপরকে দোষারোপ, দু একটা হরতাল, গাড়ি ভাংচুর যে হতো এটা আমি হলফ করে বলতে পারি। আপনি বলেছেন আপনার বাবা যিনি মসজিদ কমেটির সভাপতি(আজকের জামানায় ছোটপদের বা সৎ/আম পাবলিক কাওকে তো সভাপতি করা হয় না) মাইকে ঘোষনা করেছিলেন। কিন্তু আজকাল হলে, মুহূর্তে সরকারী দলের নেতা মাইকের দখল নিয়ে বাজখাই গলায় বলতো, “ আজ সরকারী দলকে বেকায়দায় ফেলতে, সরকারী দলের সুনাম ক্ষুন্ন করতে, আন্দলনের ইস্যু তৈরী করতে বিরোধী দলের চক্রান্ত এটা। তারপর শুরু হয়ে যেত বিরোধী দল গত ক্ষমতার আমলে কি কি আপকর্ম করেছে, কার জন্ম কোথায়, সরকারী দল কি কি সব মহৎ কাজ করেছে, কতো গুলি সাবমেরীন সম অশ্বডিম্ব প্রদান করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি হিসাব প্রদান”। এই কু এবং মহৎ কার্যনামার মধ্যে আপনি কোথায় বিলীন হয়ে যেতেন জনতাও বুঝতে পারতো না। অপর পক্ষে বিরোধী দলও কম যেতো না। মসজিদের রাস্তার বিপরীত পাশ্বেই ভাড়া করা(মসজিদের মাইক সাধারনত সরকারী দলের ই ব্যাবহার করার নিয়ম। হাজার অনিয়মের এই দেশে সরকারী/বিরোধীদল কিন্তু অলিখিত চুক্তি হিসাবে এই নিয়ম তাদের মঝে ঠিকই মেনে চলেন) মাইকে তদানুরুপ বাজখাই গলায় বলে যেত, “ আজকে এই এক দলীয় সরকারের রাজত্বে আমাদের দলীয়(আমার মাথায় আশেনা ৩/৪ বছরের শিশু কিভাবে দলীও হয়!) শিশু অপহরন/গুম হয়ে গেলো।আমরা আমাদের আমলে হ্যান করেছি-ত্যান করেছি, সরকারী দল দেশ শেষ করে দিল, কে কার কোলে বসেছে ইত্যাদি ইত্যাদি” কুরুচীপুর্ন কথার মধ্যে আপনি কোথায় হারিয়ে  যেতেন তার হিসাব নেই। আপনি হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন আজকাল যে এটা হতো তা আমি কিভাবে বুঝলাম? আজকাল মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালে যায়, কিন্তু নেতাদের পক্ষথেকে সুন্দর-সুললিত ভাষায় “মৃত্যু পরবর্তি শোক বার্তা” পৌঁছে যায় জীবিত মানুষের জন্য, তেমন এধরনের পরিস্থিতির জন্য আগে থেকেই ফরমেটেড দলীয় ভাবধারায় লেখা বক্তব্য প্রস্তুত থাকে!সেরকম ফরমেটেড লেখা থেকে আমার এ অনুমান।

আপনি আল্লার কাছে শুকরিয়া করেন যে, আপনি সে আমলে একজন আইজুদ্দিন(টমটমের দোকানের বুড়ির) কাছে পড়েছিলেন। যদি কোন কারনে আপনাকে পাওয়া নাও যেত, আইজুদ্দিনরা অত হৃদয়হীন হয় না। আপনাকে ঐ আইজুদ্দিন বুড়ি ফেলে দিত না।আপনাকে তার আরেকজন সন্তানের মতো মানুষ করতো।কিন্তু আজ তা হলে কি সেই বুড়ি ইচ্ছে থাকা স্বত্তেও তা করতে পারতো? দুর্নিতী, প্রতিহিংসা পরায়ন এই রাজনীতির যুগে, সিন্ডিকেট বাজীর এই আমলে সেখানে দ্রব্যমূল্ল্য সেখানে এক টমটম বিক্রেতা বুড়ি  কি পারতো আরেকটি অতিরিক্ত মুখের খাবার জোগাড় করতে? পারতো না, তাই প্রচন্ড অনিচ্ছা থাকা সত্যেও আপনাকে কনো এক রাস্তার কোনায় ফেলে রেখে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলতো, “বাবা বেচেঁ থাকিস, পারিস তো আমার এই অক্ষমতা, আমার এই আপারগতাকে ক্ষমা করে দিস!” তারপর যতদুর চোখ যায় ধূ ধূ দিগন্ত পর্যন্ত হেটে হেটে যেতো নিজের সন্তানের হাত ধরে বেদনাযুক্ত মনে ভাবতো আপনার কথা। কারন সে আজকার যুগের একজন রাজনৈতিক নয়, সে পারে না মানুষের দুঃখ-কষ্টকে পুজি করে রাজনীতি করতে, পারে না অন্যের কষ্টে পরিহাশ মূলক মন্তব্য করতে, কটাক্ষ করতে।কারন সে একজন আইজুদ্দিন, ১৬ কোটি আইজুদ্দিনের মতো একজন আইজুদ্দিন, যারা অন্য মানুষের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ায়, অন্যের কষ্টে ব্যাথা পায়, যারা দেশকে দলের চেয়ে বড় মনে করে!”]

মন্তব্য
  • সাআখান এপ্রিল 23, 2012 at 9:33 অপরাহ্ন

    মুক্ত যাযাবর, আপনার আমার লেখাটিতে প্রকাশিত মন্তব্যের উপরে আবার এই পোস্টটি দেখে আমি সত্যিই খুব অনুপ্রেরণা পেলাম নিয়মিত লেখা চালিয়ে যাবার এবং সেই সংগে বদলে যাও বদলে দাও ব্লগ টিমকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সুযোগ দেবার জন্য এখানে লেখালেখি করার।

    • muktojajabor এপ্রিল 24, 2012 at 12:41 অপরাহ্ন

      আসলে আপনার লেখা দেখার আগেই মন খুব খারাপ হয়ে ছিলো, বারবার দেশের এই দুই দলের ভন্ডামিতে ক্লান্ত হয়ে আপনার সুন্দর লেখা পড়ে অনেক বড় মন্তব্য লিখে মনে হলো সবাকে জানাই। আমার খালি এখন চিতকার করে বলতে ইচ্ছা করছে,”আমরা এ গনতন্ত্র চাইনি, আমরা মানুষ পোড়ানোর গনতন্ত্র চাইনি, চাইনি দুই দলের খাই-খাই গনতন্ত্র। এ ক্ষমতায় যাওয়ার ও ক্ষমতা ধরে রাখার মরিয়া ভাব, দূর্নিতী, চোর-খুনী ভরা দলকে শাষন ভার দেয়ার গনতন্ত্র থেকে আমাকে ফিরিয়ে দাও “ফকরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের” সেই শাষন সময়। যখন ১৬ কোটি আইজুদ্দিন অন্য কছু না হোক অন্তত রাতেও নির্ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারতো!”

  • Mir Abdul Alim এপ্রিল 23, 2012 at 3:25 অপরাহ্ন

    ‘হরতাল আমি তোমাকে চাই’-
    মীর আব্দুল আলীম :
    “প্রথমত আমি তোমাকে চাই, দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই, শেষ পর্যন্ত আমি তোমাকেই চাই”। হরতালে কোলাহল মুক্ত পরিবেশে স্পস্টই শোনা যাচ্ছিল চায়ের ষ্টলে বাজানো গানটি। সেই ২০/২২ বছর আগে গানটি ছিল আমার কাছে এক ধরনের অর্থবহ। আবেগ জড়িত বিষয়। অর্ধজীবন পার করে সেই গানে এখন আর আগের স্বাদ খুঁজে পাচ্ছি না। আবেগও নেই। গানের সাথে হরতালকে কেন যেন বাবর বার গুলিয়ে ফেলছি । গানের প্রেম ভালবাসার বিষয় গুলো বাদ দিয়ে ভাবছি অন্য ভাবে। অথচ এই আমিই একদিন গানটি কিভাবেই না উপভোগ করতাম। গানের সাথে সাথে মনে হচ্ছে হরতাল যেন আমরা চাই। জনগন চায় কি না জানি না। তবে রাজনৈতিক দল গুলো সময় ভেদে হরতালতো চায়ই ? হরতাল ছাড়া যেন চলে না । হরতাল যেন আমাদের বাঙ্গালী জীবনের অবিচ্ছেদ্দ অংশ হয়ে গেছে। যারা হরতাল দেন তারা ফাঁক ফোকড় খোঁজেন হরতাল দেবার জন্য। সরকার দলে থাকলে হরতাল চান না, আর বিরোধী দলে থাকলে তারা ঠিকই হরতাল চান। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর এমনই চরিত্র লক্ষ করছি বহু কাল যাবৎ । তাই শেষ হয়েও শেষ হয় না। মহাসমারোহে হরতাল বারবার ফিরে আসছে আমাদের মাঝে । যাই হোক, হরতাল আবার ফিরে এসেছে । হয়তো দুই কি একজন পাওয়া যাবে যারা হরতাল শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন । দিনের আহার দিনেই যোগার করতে হবে যার সে কি করবে? অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য? সব কি বন্ধ থাকবে? আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারবে সাধারণ মানুষের জান-মালের? জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হরতালের আগের দিন থেকেই দেশব্যাপী ব্যাপক সহিংসতা সৃষ্টি করা হয় আর এটাই এদেশের রেওয়াজ।
    ২২ এপ্রিলের হরতালকে ঘিরে ২১ এপ্রিল বিকালেই রাজধানীতে ৭টি এবং চট্টগ্রামে ৮টি বাস পোড়ানো হয়েছে। খিলগাঁওয়ে বাসে আগুন লাগিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় চালক বদর আলীকে মর্মান্তিক ভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। এছাড়া দেশের অন্যত্রও হরতাল সমর্থনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর দৈনিকগুলোতে এসেছে। এমনকি হরতালের দিনেও মানুষ মারা যাচ্ছে। নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হচ্ছে। এর দায় কে নেবে? রাজনৈতিক দলের কাজ কি শুধুই জনগণের ভোগান্তি বাড়ানো ? হরতাল এলেই জ্বালাও পোড়াও হয়। জান মাল উভয়ের ক্ষতি হয়। হরতালের আগুনে আর কতো পুড়বে দেশের সম্পদ? আরো কতো ভোগান্তি বাড়বে সাধারণ মানুষের ? যে দিনই, যে ইস্যুতেই হরতাল ডাকা হোক না কেন এর আগের দিন কয়েকটি গাড়ি পোড়ানো যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এর ফলে দেশের সম্পদ যে বিনষ্ট হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ যে পুড়ে মারা যাচ্ছে এদিকে কারো খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। এর চেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার আর কী হতে পারে? অথচ দেশের বড় দলগুলো অনেকবারই হরতালের কর্মসূচি না দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কেউই কথা রাখেনি, যা খুবই অনাকাক্সিক্ষত। এসবের মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনের ত্রাহি-ত্রাহি দশা। বলার অপেক্ষা রাখে না, ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা খুবই উদ্বেগের; কিন্তু হরতাল-গাড়ি পুড়িয়ে কি ইলিয়াস আলীর হদিস পাওয়া যাবে? হরতাল যে কোনো রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার; কিন্তু হরতালকে কেন্দ্র করে গাড়ি পোড়ানোর রেওয়াজ কি কোনো দেশে আছে? তাই হরতালকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা থেকে সকলের সরে আসতে হবে। আর কোনো উদ্বেগজনক পরিস্থিতির যাতে উদ্ভব না হয় সে জন্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে। সর্বোপরি চলমান পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের উচিত যতো দ্রুত সম্ভব ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করা এবং বিরোধী দলের উচিত আরো সহনশীলতার পরিচয় দেয়া।
    বাংলাদেশের ইতিহাসে কত হরতাল হয়েছে, তার লেখাজোখা নেই। এদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল হরতাল-ধর্মঘট। নব্বইয়ের আন্দোলনে হরতালই কাজ করেছে গণতন্ত্রের মুক্তির অস্ত্র হিসেবে। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসার পরও বহু হরতাল হয়েছে। স্বাধীনতার আগে হরতাল হতো পাকিস্থানি শাসকদের মোকাবেলার জন্য। তখন হরতাল ছিল জনমুখী ও স্বতঃস্ফূর্ত। অর্থাৎ জনগণ নিজেরাই হরতাল পালন করত, কাউকে বাধ্য করা হতো না হরতাল পালনে। সে হিসেবে হরতালকে বলা হয় গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু হরতালের নামে গত দুই যুগ ধরে কী হচ্ছে? হরতাল বিএনপি করছে, আওয়ামী লীগ করেছে। ছোটখাটো দলগুলোও হরতালে কম যায় না। হরতাল করব না বলেও সে কথা কেন রাখতে পারে না রাজনৈতিক দলগুলো? ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ইস্যুতে হরতালে হালে পানি পেয়েছে বিরোধী দলগুলো। মনে হচ্ছে বিরোধী দলে সাহস জেগেছে। এ অবস্থায় দেশ দিন দিন হরতালের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। হরতাল দেয়া যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার, হরতাল পালনে বাধ্য করা আও হরতাল ভাঙতে বাধ্য করাÑ উভয়ই গণতান্ত্রিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। আমাদের দেশের অনেক বড় একটি ব্যমো করেছে । দিনকে দিন বেড়েই চলেছে । গাড়ি ভাংচুর, জ্বালাও পোড়াও । ছাত্রদের দু দলে কিছু হয়েছে? রাস্তায় নামো, বাস ভাঙ্গ । মালিক দাবী মানছে না? রাস্তায় চলো- গাড়ি ভাঙ্গ । গাড়ি চাপা পড়েছে কেউ? আবার নামো রাস্তায় । ঢালো পেট্রোল; জ্বালাও গাড়ি। মিছিল-মিটিঙে পুলিশের বাঁধা? আর কি করার আছে গাড়ি ভাংচুর করা ছাড়া? এত অবলীলায় বোধ করি আর কোন দেশে এই উদ্ভট কান্ড ঘটেনা । জাতীয় সম্পদ নষ্ট করতে তাদেও এতটুকুও সংকোচ বোধ নেই। যারা কাজটি ঘটাচ্ছে তারা কি বোঝে না? যারা করছে জেনে বুঝেই করছে । জেনেশুনে নিজের পায়ে কুড়াাল একমাত্র মানুষই মারতে পারে । হরতাল হউক না হউক। হরতল যৌক্তিক না অযৌক্তিক তা ভিষয় নয়। হরতালের যোগসূত্রে কোন গাড়ি ভাংচুর হবেনা, কোন গাড়িতে আগুন দেয়া হবেনা, চাওয়াটা কি খুব বেশি অযৌক্তিক?
    ক্ষমতায় থাকলে হরতাল চান না; ক্ষমতায় না থাকলে চান। দায়িত্বশীল প্রধান দলগুলোর এমন ভূমিকায় দেশের আমজনতাকে হতাশ হতে হয়। এ অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর কতটা আস্থা রাখতে পারি আমরা? জনগণের চোখে তাদের ভাবমূর্তিরইবা অবশিষ্ট কী থাকে? কারণে-অকারণে হরতাল হোক, বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হোকÑ এমনটি কেউ চায় না। হরতাল হলে শ্রমঘণ্টার অপচয় হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয়, অর্থনীতির ক্ষতি হয়। তাই বলে দেশের কোন রাজনৈতিক দল হরতাল ডেকেছে বলে ঢালাওভাবে বিষোদগার করতে হবে, তাদের পিছু নিতে হবে, তা-ও ঠিক নয়। এ দৃষ্টিভঙ্গি গণতান্ত্রিকও নয়। হরতাল নিয়ে দোষাদোষীতে দেশের বারোটা যে বেজে যাচ্ছে, তার খবর কে রাখে? বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলো আর কতকাল পর উপলব্ধি করবে? আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোÑ দু’পক্ষই সরকারে থাকলে এক রকম আচরণ করে, সরকারের বাইরে গেলে করে বিপরীত আচরণ। সরকারে থাকলে তারা হরতালের বিরুদ্ধে থাকে। তখন তারা বুঝতে পারে হরতালে দেশের ক্ষতি হয়, প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। বিরোধী দলকে এসব বিষয়ে জ্ঞানদান করতে থাকে। তারা এরপর বিরোধী দলে গেলে আর হরতাল ডাকবে না, এ মর্মে প্রতিশ্রুতিও দিতে থাকে, যা কখনও পালিত হয় না। কেউ কথা রাখে না। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলই দু’দশক ধরে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে হরতালকে ব্যবহার করে আসছে।
    জনমুখী আন্দোলনের অন্যতম অস্ত্র (?) হিসেবে হরতালকে যেদিন থেকে রাজনীতিকরা গুরুত্ব দিয়েছেন, সেদিন থেকেই সর্বনাশের শুরু। সর্বনাশের আগের ধাপ কর্মনাশ। হরতালের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখার মতো সাহস মানুষের আর নেই। বিরোধী দল ও সরকার উভয় পক্ষই হরতাল হওয়া-না হওয়ার পক্ষে শক্তির মহড়া দেয়। উভয় পক্ষই রাজপথে নেমে পড়ে। সরকার ও বিরোধী দলগুলো বিধ্বস্ত-আতংকিত মানুষের অভিব্যক্তিকেই হরতালে ‘সাফল্য’-‘ব্যর্থতা’ বলে সগর্বে প্রচার করে। হরতাল এখন দেশের জনজীবনে পথসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ এগিয়ে বা পিছিয়ে যাক, হরতাল তার সঙ্গে সঙ্গে আছে।
    হরতাল মানেই ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও। এভাবে গাড়ি ভাঙচুর করা হবে কেন? কে ভাঙে, কেন ভাঙে, কেন হরতাল সফল হয়, কীভাবে হয়Ñ এসব সাধারণ মানুষের জানতে বাকি নেই। তবে কর্মনাশা হরতাল আদৌ কি তাদের কোন স্বার্থরক্ষা করতে পারে? সমস্যা সমস্যার জায়গাতেই থাকে। বরং হরতাল সমস্যা আরও প্রকট করে। নিছক ক্ষমতার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে এক দলকে হটিয়ে আরেক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশব্যাপী হরতাল ডেকে জনগণকে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করা সংবিধানে প্রদত্ত ‘গণতান্ত্রিক অধিকারে’র পর্যায়ে পড়ে না। এতে হরতাল আহ্বানকারীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে বাদবাকি জনগণের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়। বস্তুত আমাদের দেশে এখন যে ধরনের হরতাল হয় এবং সে হরতাল যেভাবে ‘সফল’ হয়, তা রাজনৈতিক সন্ত্রাস ছাড়া কিছুই নয়। দেশে যে কোন বড় রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রচারণার জন্য হরতালই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ কর্মসূচি। মুক্তাঙ্গনের মতো ছোট জায়গায় সভা করতে গেলেও কিছু প্রস্তুতি দরকার হয়। স্টেজ বানাতে হয়, মাইক বঁাঁধতে হয়, কিছু লোকসমাগম প্রয়োজন হয়। নেতানেত্রীদেরও উপস্থিত হতে হয়। কিন্তু হরতালে এর কিছুই দরকার হয় না। কেবল ঘোষণা দেয়া। অতঃপর হরতাল ঠেকাতে সরকার ও সরকারি দলের তৎপরতাই হরতাল সফল করার জন্য যথেষ্ট। হরতাল ঘোষণাকারী নেতানেত্রীরা যার যার বাড়িতে বসে থাকলেও হরতাল হয়ে যেতে পারে। বড় দল তো বটেই, মাঝারি ধরনের জনসমর্থন আছে এমন দলের পক্ষ থেকে হরতাল ডাকা হলেও তা ‘সফল’ হতে পারে।
    তবে এ হরতাল আমাদের কতটুকু কল্যাণ বয়ে আনছে, অন্তত দেশের কল্যাণে তা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাবতে হবে।
    গণতন্ত্রে সুস্থ রাজনীতির বিকল্প নেই। সরকারে থাকাকালীন ‘হরতাল করব না’, বিরোধী দলে গেলে ‘হরতাল করব’Ñ এমন দ্বৈতনীতি পরিহার করতে হবে। হরতালের ব্যাপারে সুুনির্দিষ্ট ছক তৈরি করতে হবে। আমাদের রাজনীতিকদের হরতালের বিষয়ে ঐকমত্য থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে যেন দেশের অমঙ্গল না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অগত্যা হরতাল করতে বাধ্য হলে জনস্বার্থের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। হরতালের বিষয়ে দুই নেত্রীর জনগণকে দেয়া ওয়াদা যেন ঠিক থাকে, এটাই সবার প্রত্যাশা।
    মীর আবদুল আলীম : প্রাবন্ধিক ও নিউজ-বাংলাদেশ ডটকমের সম্পাদক

    • muktojajabor এপ্রিল 23, 2012 at 7:32 অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ আলীম ভাই, আপনার সাথে আমি এ্কমত। সাথে শুধু বলবো,”আমরা এ গনতন্ত্র চাইনি, আমরা মানুষ পোড়ানোর গনতন্ত্র চাইনি, চাইনি দুই দলের খাই-খাই গনতন্ত্র। এ ক্ষমতায় যাওয়ার ও ক্ষমতা ধরে রাখার মরিয়া ভাব, দূর্নিতী, চোর-খুনী ভরা দলকে শাষন ভার দেয়ার গনতন্ত্র থেকে আমাকে ফিরিয়ে দাও “ফকরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের” সেই শাষন সময়। যখন ১৬ কোটি আইজুদ্দিন অন্য কছু না হোক অন্তত রাতেও নির্ভয়ে বাড়ি ফিরতে পারতো!”

© বদলে যাও, বদলে দাও!