Home » গণমাধ্যমে শিশুদের জন্য বাংলায় বিনোদন চাই » একটি সতর্কীকরণ রচনা: ডিজিটাল গণমাধ্যম বনাম আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি সতর্কীকরণ রচনা: ডিজিটাল গণমাধ্যম বনাম আমাদের তরুণ প্রজন্ম

669 বার পঠিত

ভূমিকা:

বর্তমানের তরুণ প্রজন্মের কাছে আপনি যদি কোন জরুরী বা বিশেষ বার্তা দ্রুত পৌঁছে দিতে চান, তাহলে কোন্ মাধ্যমটি ব্যবহার করবেন? আমি নিশ্চিত, সংবাদপত্র, টিভি বা চলচ্চিত্র… কোনটাই প্রথমে আপনার মনে আসবেনা। কারণ আপনি জানেন, এফ.এম. রেডিও-র চেয়ে কিশোর-তরুণদের কাছে জনপ্রিয় আর কোন গণমাধ্যম এই মুহূর্তে দেশে নেই। সম্ভবত: জনপ্রিয়তার তালিকায় এরপরই আছে ফেইসবুক। ডিজিটাল এই যুগে একটি প্রজন্মের মেধা-মননে এবং লাইফস্টাইলের অনেকখানি প্রভাবান্বিত হয় এই এফ.এম. রেডিও এবং ফেইসবুক দ্বারা। সুতরাং এখানে কী প্রচারিত হয় তা যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে নেওয়া উচিত।এই দুটি জনপ্রিয় গণমাধ্যম নিয়ে কিছু নেতিবাচক কথা এখানে বলতে চাই এবং সকলের সোচ্চার মতামত ও সক্রিয় উদ্যোগ আশা করছি।

১. এফ. এম. রেডিও

ইদানীং এফ.এম রেডিও-তে বিদেশী গান খুব ঘন ঘন বাজতে শুনছি, যা আমার কাছে একটি অশনি সংকেত। কোন কোন রেডিও স্টেশনে সপ্তাহে একদিন “ওয়ার্ল্ড মিউজিক” বা এজাতীয় নামে একটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। বিশ্বের জনপ্রিয় গানগুলো শ্রোতারা সেখানে শুনতে পারেন। এটি ইতিবাচক্। বিশ্বায়নের এই যুগে আমরা শুধু বাংলা গান শুনব, তা ঠিক নয়। কিন্তু আমি দুয়েকটি দেশী রেডিও স্টেশনে ঘন্টায় ৪-৫টি হিন্দী গান বাজতে শুনে চমকে উঠেছি। এটা কি “পাবলিক ডিমান্ড”, নাকি কাউকে খুশী করার চেষ্টা? প্রসঙ্গত: ঐ অনুষ্ঠানটির স্পন্সর ছিল এমন একটি টেলিকম কোম্পানী, যার মূল কোম্পানী (মাদার কোম্পানী) ভারতীয়। অথর্নীতির একটি সূত্র বলে, চাহিদা নির্ভর করে সরবরাহের উপর। আবার আরেকটি সূত্রমতে, সরবরাহ নির্ভর করে চাহিদার উপর। এখানে আমার মনে হচ্ছে সরবরাহ বাড়িয়ে চাহিদা তৈরীর চেষ্টা  চলছে। আমাদের দেশের সংস্কৃতিতে ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন এখন একটি বিপদ সংকেতের পর্যায়ে চলে এসেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হিন্দী কার্টুন দেখে বাংলা বলতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। গৃহিনীরা প্রভাবান্বিত হচ্ছেন হিন্দী সিরিয়ালের সাজসজ্জা আর সাংসারিক কুট-কচালী দেখে। এখন যদি এফ.এম. রেডিওতে বাংলা গানের পাশাপাশি যখন-তখন হিন্দী গান বাজে, তাহলে হিন্দীগানের প্রতি আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভক্তি আরো বেড়ে যাবে। ধীরে ধীরে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে দেশী গানের প্রতি। “স্লো পয়েজন” আর কাকে বলে?

অশুদ্ধ ইংরেজী আর ভুল বাংলায় অনেক আর.জে.(রেডিও জকি)-কে কথা বলতে শুনে আমরা অনেকেই চমকে উঠছি। সরকার নতুন আইন করেছেন। বাংলা একাডেমীতে নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। কিন্তু আইন করে মানুষের মুখের ভাষা বদলানো যায়না। সময়ের সাথে সাথে ভাষায় কিছু পরিবর্তন আসবেই। যেটা প্রয়োজন তা হলো সঠিক দিকনির্দেশনা তৈরী করা। আইন আসবে তারপর। অথচ অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতো এখানেও ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের তরুণেরা তাই বিভ্রান্ত। ঠিক-ভুলের এক অদ্ভুত দোলাচলে দুলছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

আমার মনে হয়, আর.জে.-দের একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, ইংরেজীতে কথা বললেই স্মার্ট হওয়া যায়না। শুদ্ধ বাংলায় কথা বললে বরং বেশী স্মার্ট শোনায়। আমার মনে আছে, আমরা ছাত্রজীবনে যখন বুয়েট ডিবেটিং ক্লাবে বিতর্ক করতাম, তখন বাংলার মধ্যে ইংরেজী কোন শব্দ বলে ফেললে দাঁতে জিভ কাটতাম ভুল হয়েছে বলে। ইংরেজী-বাংলা মিশিয়ে কথা বলাটা ছিল তখন গর্হিত অপরাধ।যারা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ১০০% বাংলায় তাদের বক্তব্য রাখতে পারত, তারা বিশেষ গর্বে গর্বিত হতো। এই রচনায় আমি নিজেই বাংলা-ইংরেজী মিশিয়ে লিখছি বলে ক্ষমা চাইছি। অবশ্য এটা সময়ের দাবী। কিন্তু অপ্রয়োজনে কোন ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করছি কি? বাংলা একাডেমী এখন এটাই বলছেন, অপ্রয়োজনে ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করা যাবেনা। “চেয়ার”কে “কেদারা” বলার দরকার নেই; তবে “কী খবর?” না বলে “হোয়াটস্ আপ” বলাটা কি খুব দরকার? বাংলা একাডেমীর সভাপতি জনাব আনিসুজ্জামান এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, “গান” না বলে “সং” বলতে হবে কেন?

 

২. ফেইসবুক

আমি যেখানে চাকরী করি, সেখানে দুপুর ১টা থেকে ৩টা এই ২ ঘন্টার জন্যে ফেইসবুক ও অন্যান্য ওয়েবসাইটে ব্রাউজ করা অনুমোদিত। অন্য সময়ে চাইলেও কোন ওয়েবসাইটে ঢোকা যায়না (অবশ্যই জরুরী প্রয়োজনে বিশেষ অনুমতিসাপেক্ষে যায়)। এমন নিয়মের কারণ আমাদের দায়িত্বহীনতা। সুযোগ পেলে আমরা কেউ কেউ সারাদিন ফেইসবুক, ব্লগ, স্টক এক্সচেঞ্জ ইত্যাদি ওয়েবসাইটে ঢুকে অফিসের কাজে ফাঁকি দিই। ঠিক একইভাবে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ন্ত্রন করা প্রয়োজন। নইলে লেখাপড়া বাদ দিয়ে যারা দিনরাত নেশার মতো এসব নিয়ে পড়ে থাকে তাদের ভবিষ্যতের অন্ধকারে কোনভাবেই আলোকপাত করা যাবেনা। এবং তখন এ ভুল শোধরানোও যাবেনা। বাবা-মায়েদেরকে নানাভাবে চাপ দিয়ে ছেলে-মেয়েরা ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কিনছে। আনলিমিটেড বা লিমিটেড, যার যেমন সামর্থ, ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। প্রযুক্তির এই যুগে কাউকেই ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবেনা। কিন্তু সীমারেখাটা টেনে দেবার দায়িত্ব নিতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। অভিভাবকেরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন তার সন্তান কতটুকু সময় ইন্টারনেটের কোন ওয়েবসাইটে ব্যয় করে থাকে (যেসব অভিভাবকেরা কম্পিউটার কম বোঝেন, তারা আনায়াসেই শিখে নিতে পারেন  অন্তত: সন্তানের ভবিষ্যতের স্বার্থে)। এবং আই.এস.পি. (ইন্টারনেট সার্ভিস প্র্রোভাইডার)কে শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোন থেকে না দেখে সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকটিও বিবেচনা করতে হবে। তারা প্রয়োজনীয় “লগ”(ব্যবহারসংক্রান্ত উপাত্ত) সরবরাহ করতে পারেন অভিভাবকদেরকে; যা থেকে জানা যাবে নিষিদ্ধ কোন ওয়েব সাইটে সন্তানেরা ঢুকছে কিনা, কতটুকু সময় তারা ভাল ওয়েবসাইটে কাটায় ইত্যাদি। কাউকেই ভুলে গেলে চলবেনা, এখন যারা ছাত্র, কয়েক বছর পর এরাই হবে দেশ পরিচালক। কেউ ডাক্তার হবে, কেউ প্রকৌশলী। কেউ সচিব হবে, কেউ হবে ব্যবসায়ী। কেউ হয়ত পুলিশ হবে, কেউ হবে রাজনীতিবিদ। যে যাই হোক, মূল্যবোধের ভিত্তিটা কিন্তু শক্তপোক্ত হয় এই ছাত্রজীবনে।আর তার প্রভাব পড়বে তাদের কর্মজীবনে। আশেপাশের মানুষের আচরণ থেকে এরা যেমনটা শেখে, তেমনি গণমাধ্যম থেকেও ওরা নিচ্ছে অনেক কিছু, নিজেদের অজান্তে। যে কোন “পাবলিক প্লেসে” গেলে আপনি তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে কিছু নতুন নতুন আচরণ পাবেন, যা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে “জেনারেশন গ্যাপ” বলে একটা বিষয় যুগ যুগ ধরে ছিল, আছে, থাকবে। একে মেনে মিতে হবে। তবে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে তা আমাদের সংস্কৃতির জন্যে হুমকী হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা। ফেইসবুকে বেশকিছু গ্রুপ বা পেইজ আছে যা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কুরুচিপূর্ণ, নোংরা রসিকতা আর অশ্লীলতাকে সার্বজনীন করার জন্যে জুকারবার্গ নামের সেই কানাডীয় তরুণ ফেইসবুক প্রতিষ্ঠা করেননি। কিন্তু কিছু মানুষ যুগে যুগে সব সমাজেই থাকে, যারা ভাল জিনিসকে খারাপ কাজে ব্যবহার করার “সৃজনশীল” কাজটি নিষ্ঠার সাথে করে থাকে। এগুলো বন্ধ করার জন্যে কোন উদ্যোগ কেউ নেয়না। যার কুফল পড়ছে কিশোর-তরুণদের রুচি, মনন আর মূল্যবোধের ওপর।

উপসংহার

রেডিও অনেক শক্তিশালী মাধ্যম। ১৯৭১-এ স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র তা প্রমাণ করেছে। আর ইন্টারনেট হলো আলাদীনের সেই চেরাগ, যা ভাল মানুষের হাতে গেলে পৃথিবীর মঙ্গল হয়, আর অসুরের হাতে পড়লে আসে ধ্বংস। তাই সময় থাকতে ভুলগুলো শুধরে নেওয়া অতীব জরুরী।

________________

সংযোজনী:

এফ. এম. রেডিওতে হিন্দী গান প্রচার সম্পর্কে আমার ফেইসবুক বন্ধুদের কাছে মন্তব্য চেয়েছিলাম। নীচে সেগুলো হুবহু তুলে দিলাম:

আসিফ আহমেদ (প্রবাসী):  bideshi ganer jonno program time thakte pare….but jodi ohoroho baje tobe seta kono dik thekei vlo noy….

আরিফ চৌধুরী (প্রবাসী): ekta alada Hindi Channel kore deya better. Oita beshi cholbe. Ekhonkar lukjon 21st feb e ki hoyechilo janena, 12 ta bangla masher naam bolte pare na, oder jonno ekta full time hindi channel dorkar urgently….

মো: কামরুজ্জামান (প্রকৌশলী, সরকারী প্রতিষ্ঠান): Ei bepare ekta writ kora jay. Jate Hindi gaan na bajano hoy.

আকতার হোসেন (উপ-ব্যবস্থাপক, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান): Era nischoy kokhon BANGLA rochona, kobita kingba golpo pore nai chotobelai. Era jara stationgulo chalai tara ai juger r era khub ekta kosto kore answer paper ready kore nai, teacher er ta sobai copy kore nito. Creativity tai zero. Patriotism almost zero sudhu premika k jevabe cholona kore bole ‘jaaaan, amar janta aaj mon kharap keno’ .. Temni tara hoyto spanish guitar a ekti deshattobodhok gaaner sur tulte pare but never ever respect the true patriotic feelings. Bisser sathe tal melate hole bideshi gaan bajano jai special segment a, tai bole ekchetia hindi kei bideshi gaan hisebe beshirvag somoy chalano…. Ami pochondo korte parchina. Karon ai programgulo ek ekta tutorial class er moto. Jodi boli driver class er jonno bajabo hoy taholeo .. Driverder development er jonn radio’r contribution ke erokom howa uchit? Thanks.

ইয়কুব আলী (প্রকৌশলী, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান): Ajkal na bondhu onek age thekei. “Radio amar” bole ekta channel ase jader slogan hoss “Bangladesher protiddhon” tara suru thekei hor hamesa hindi gan bajai. Radio foorti ebepare r ek kathi egie, tara banglar cheye hindi gan besi bajai. Today sudhu matro world music bole soptahe ekta onusthane kore sekhane bivinno deser hindi gan bajai hindi soho. R abc teo mone hoi eki rokom ekta onusthan hoi. Ami obosso onek ager kotha bolsi. Edaning r radio suna hoi na. R notun channel gular bepare dharona nai. Tobe amar jeta mone hoi public jeta besi khabe ora to setai bajabe, karon asol kotha hosse bebsa. Jetai besi lav sei mal e manus dokane besi rakhe. Jara fm sune tara amader ai d juice generation ebong tara nijeder k smart proman korar jonno bidesi culture e beri posondo kore. Na hole dunia theke pise pore jaoar asonka thake.

তৌফিক হোসেইন (কর্মকর্তা, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান): hindir proti manusher beshi fascination er karon hindi chennel er bapok agraashon and at the same time deshi chennel gulor cheap entertainment,, though now our deshi chennel gulo onek ta outstanding… but the main problems holo deshi MOVIE gulor nimno maan,, tokhon manush autometically hindi movie dekhe and shekhan thekai hindir proti fascination shuru hoi…. and every chennel has their business policy according to trend ….

মন্তব্য
  • Qazi Manzur Karim (কাজী মিতুল) এপ্রিল 24, 2012 at 12:22 অপরাহ্ন

    correction: Mark Zuckerberg is not Canadian, he is from USA.

  • A LIBRARY OF RURAL DEVELOPMENT(SAYED CHOWDHURY) এপ্রিল 23, 2012 at 7:07 অপরাহ্ন

    আসলে বিনোদনের মাধ্যমগুলো দিনদিনই পরভাষা, পর সাংস্কৃতি এবং পর চলনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে । তারপরও ভালো জিনিসগুলো আহরোন করা ছাড়া উপায় নেই । যা নিজে থেকেই করতে হবে । তবে সবচেয়ে চিন্তার বিষয় আমাদের শিশুদেরকে নিয়ে । তাদের খেয়াল রাখাটাই আমাদের কর্তব্য ।
    আরেকটা কথা, একই ফুল থেকে ভ্রোমর নেয় মধু এবং প্রজাপতি নেয় বিষ । আমরা যেন প্রজাপতি না হয়ে যাই ।
    অশেষ ধন্যবাদ চিন্তামূলক লেখাটি লেখার জন্য ।

© বদলে যাও, বদলে দাও!