ছেলেটি রাস্তার অন্যপাশে অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। চোখেমুখে তার মহাবিস্ময়ের ছাপ। বাবার হাত ধরে হেঁটে যেতে যেতে বাবাকে জিজ্ঞাসা করে ফেলল, “আব্বা, ঐগুলা কী?”
ছেলের কথায় রাস্তার দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সদর আলী বললেন, “কোনগুলা কী?”
ছেলে হাত ইশারায় রাস্তার অপর পাশে এক রেস্তোরার সামনে আগুনে পুড়াতে থাকা কিছু একটা দেখিয়ে দিল।
বাবা সদর আলী একটু হেসে বললেন, “ ঐগুলা শিক কাবাব আব্বা।আগুনে পুড়াইয়া খাইতে হয়। ”
কোন খাবার এভাবে পুড়িয়ে খাওয়া হতে পারে তা জানা ছিল না ছোট ছেলেটির।
তাই আবার জিজ্ঞাসা করে বাবাকে, “আব্বা, এইগুলা কি মাইনষে খায়?”
ছোট্ট ছেলেটার এমন প্রশ্নে হেসে ফেলেন সদর আলী। বলেন, “ হ আব্বা, এইগুলা মাইনষে খায়।”
“আমারে খাওয়াইবা না আব্বা?”
ছেলের এমন সরল আবদারে চোখটা ছলছল করে ওঠে সদর আলীর। বলে, “খাওয়ামু আব্বাজান। আমি কাইল ফিরা আইসাই তোমারে কাবাব খাওয়ামু।”
ছোট্ট ছেলেটার মুখে একটা তৃপ্তির আভা খেলে যায়। ফাঁকা পকেটে ছেলের আবদার মেটাতে না পেরে মুখটা গম্ভীর হয়ে যায় সদর আলীর।বুকের ভেতরটা খচখচ করতে থাকে । সারাক্ষণ কানে বাজতে থাকে একটাই কথা, “আমারে খাওয়াইবা না আব্বা?”
পেশায় ড্রাইভার সদর আলী দুপুরের খাবারটা খেয়েই তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরে।রাতে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাতে হবে। তাই এই দুপুরের সময়টা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। একটা যুতসই ঘুম দিতে হবে। না হলে রাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে থাকতে ভীষণ অসুবিধা হবে।
এই ভেবে সে তার গাড়িতে গিয়ে ওঠে। গাড়ির দরজাটা ভালোভাবে লাগিয়ে মাঝামাঝি জায়গায় একটা সিটের উপর গিয়ে শুয়ে পড়ে। আগের দিনের পরিশ্রমে একটু সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে সদর আলী।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে দেখতে থাকে, নিজ হাতে সে তার ছেলের জন্য কাবাব বানাচ্ছে। কাবাবের নিচে থাকা আগুনটাকে জিইয়ে রাখার জন্য মাঝে মাঝেই আগুনটাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু, হঠাৎ কাবাবের নিচে রাখা আগুন থেকে তার ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলটাতে আগুন ধরে যায়।সে আগুন নেভানোর জন্য হাতের অন্য আঙ্গুল গুলো দিয়ে চেপে ধরে বুড়ো আঙ্গুলটা । বুড়ো আঙ্গুলে লাগা সে আগুন আস্তে আস্তে ছড়িয়ে যায় হাতের অন্য আঙ্গুলগুলোতেও। এর পর অন্য হাতে,হাত বেয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা বুকে, গলায়, মাথায়। অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার দিয়ে গিয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে সদর আলী। কিন্তু, এ কী! সারা গাড়িতে যে আগুন জ্বলছে!ঘুমের মধ্যে দেখা আগুনটা সত্যি সত্যি বুড়ো আঙ্গুল কে জড়িয়ে ধরেছে, গলায় ধরেছে, পায়ে ধরেছে। চিৎকার দিয়ে ওঠে সদর আলী। তার গগন বিদারী আর্তনাদ গাড়িটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত মানুষের কান পেরিয়ে দূরে থাকা একটা বড় দালান থেকে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে সদর আলীর কাছেই। সেই করুণ প্রতিধ্বনি শুনতে শুনতে গাড়িটার মধ্যে ঢলে পড়ে সদর আলী।
ওদিকে সদর আলীর ফুটফুটে ছেলেটা তার বাবার ফিরে আসার জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। কাবাবের কল্পিত স্বাদে ক্ষণে ক্ষণে তার জিহ্বায় জল আসতে থাকে।
কিন্তু,হায়, সদর আলীর নিষ্পাপ, ফুটফুটে, ছোট্ট ছেলেটা জানে না, তার বাবার মত সদর আলীরা নিজের ছেলের মুখে শখের কাবাব তুলে দেওয়ার জন্য এই এত্তগুলো কাবাব নিয়ে ফেরেন না। স্বার্থলোলুপ কয়েক জোড়া চোখের ইশারায় তাঁরা ফেরেন জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে পুড়ে মানব-কাবাব হয়ে। সেই ছোট্ট ছেলেটা এটাও জানে না, প্রতি পাঁচ বছর পর পর আমরা সবাই একেক জন সদর আলী হবার জন্য উৎসব করে লম্বা একটা লাইনে দাঁড়িয়ে যাই। আর দিনের পর দিন গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকি জ্বলে পুড়ে আস্ত একটা কাবাব হয়ে যাওয়ার জন্য।
[উৎসর্গঃ ২২ এপ্রিল হরতালের আগের দিন খিলগাঁও এর এক বাসে ধরিয়ে দেওয়া আগুনে নিহত ঘুমন্ত বাস চালক বদর আলী বেগ (৪০) কে, তাঁর আত্মার শান্তি কামনায়...]
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী।






এই জঘন্য ঘটনার জন্য এই মানুষ রূপী জানোয়ার গুলোর চরম শাস্তি চাই। আসুন, আমরা এই সকল রাজনীতিবিদদের ধিক জানাই, ঘৃণা জানাই। আসুন, আমরা এখন আর শুধুই মার্কা দেখে ভোট না দেই, মানুষ দেখে, তার সততা দেখে, শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখে ভোট দেই। আমরা ভালো মানুষ না পেলে “না” ভোট দেই।
ধন্যবাদ সাআখান ভাই , আপনার মন্তব্যের জন্য।
কোন এক লেখায় পড়েছিলাম , কোন সৎ মানুষ নাকি আর এখন রাজনীতিতে আসে না। আগে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু এখন বিশ্বাস করি। করতে বাধ্য হই। তাই রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ‘সৎ ও যোগ্য’ প্রার্থী খোঁজা হয় না আর।
ধন্যবাদ অরূপ, সুন্দর একটি লেখার জন্য। আসলে আমাদের দেশে ভোট প্রদান অনেকটা নেশার মতোনই। তাই দেখবেন ৫ বছর আমরা দুঃশাষনে থেকেও, ভোটের আগে পুরো জাতি কেমন নেশায় পরে যাই। যার যার দলের নেতা-নেত্রী এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই আমরা নেশার পতঙ্গের মতো তাদের পিছে ছুটে যাই। আমার মনে আছে কলেজে পড়ার সময় একবার নির্বাচনে আমি নিজে বলছিলাম,” ……….. অমুক দল থেকে কলাগাছ দাড়া করিয়ে দিলে কলাগাছই নির্বাচনে জিতবে”। তখন কম বয়সে হোক আর ভোটের “নেশার” তাড়নায়ই হোক ভুলে গিয়েছিলাম আগামী ৫ বছর এই কলাগাছই আমাদের পশ্চাতদেশে লেগে থাকবে। তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝতে পারি, আমার বিষ্মাস ৭০% বংলাদশের মানুষ এখন বুঝতে পারে। আমাদের কাজ এখন থেকে মানুষদের বুঝানো, তাদের বলা ভোটের সময় তথাকথিত নেশায় না পরা, এখন থেকে যোগ্য লোকদের নির্বাচন করা, তাদের আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহনের জন্য উদবুদ্ধ করা, ভোটের সময় তাদের জয়যুক্ত করার চেষ্টা করা, হোক সে আওয়ামিলীগ, বি এন পি, জাতিয় পার্টি অথবা নিরপেক্ষ মতধারার(শুধু রাজাকার মতাদর্শি না হলেই হয়)। সব দলেই দেশের জন্য কাজ করার, পরিষ্কার ইমেজের লোক আছে, মার্কা না দেখে আমাদের প্রার্থী দেখে ভোট দিতে হবে। আমাদের এই কালচার টা গড়ে তুলতে হবে।ধন্যবাদ আপনাকে।
আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ মুক্তযাযাবর ভাই।
আমাদের সারা দেশে দোকান তো মোটে দু’টো। আর দুটি দোকানই ভীষণ ভাবে নোংরা।