Home » নৌ-দুর্ঘটনা বন্ধ করতেই হবে » একটি ভয়াবহ লঞ্চ দুর্ঘটনা ও জীবন মরণের গল্প………..

একটি ভয়াবহ লঞ্চ দুর্ঘটনা ও জীবন মরণের গল্প………..

457 বার পঠিত

এক.

দুই হাজার পাঁচ সালের ঊনিশ ফেব্রুয়ারী । সে দিনের রাতটি স্বপনের জীবনে স্বরণীয় হয়ে আছে। সে ভয়াবহ রাতটি থেকে তার জীবন পাল্টে গেছে। নানা পরিবর্তন এসেছে তার-জীবনে। এখনও সে রাতটির কথা মনে হলে, স্বপন আৎকে উঠে। রাতে ঘুমুতে পারে না।  সে রাতে লঞ্চ দূর্ঘটনার ইতিহাসে ভয়াবহ একটি দুর্ঘটনা ঘটে। ঢাকা থেকে চাঁদপুর জেলার মতলবের উদ্দেশ্যে, রাত সাড়ে দশটায় সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া, এম.ভি মহারাজ লঞ্চটি, ঢাকার অদূরে পাগলায় নিমজ্জিত হয়ে দুইশ ছাব্বিশ জনের (সরকারী হিসেব মতে) সলিল সমাধী ঘটে।

আমি যখন সে ভয়াল রাতটি নিয়ে,স্বপনের সাথে কথা বলতে চেয়েছি, স্বপন আপত্তি জানিয়ে বলেছে,“সে দিনটির কথা আমি মনে করতে চাই না। বলতেও চাই না। আমি ভুলে থাকতে চাই। বললে রাতে ঘুমুতে পারি না। আমি অস্থির হয়ে উঠি।” তবুও জোর দেয়াতে,পূর্ব পরিচিত হিসেবে বড় ভাইয়ের অধিকার নিয়ে বলাতে,বলতে রাজী হয়েছে। সাথে থাকা মিনি রেকর্ডার অন করে স্বপনের হাতে দেয়ার পর, কিছুক্ষন চুপ থেকে উদাস হয়ে,আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপন বলতে শুরু করেছে। স্বপনের নিজের ভাষায় শুনি সে কি বলছে…………..

দুই.

আমি মাজহারুল ইসলাম স্বপন। বাবা শফিকুল ইসলাম। গ্রামের বাড়ি, চাঁদপুর জেলার, মতলব দক্ষিণ উপজেলার পইলপাড়া গ্রামে । দুই হাজার পাঁচ সালের ঊনিশ ফেব্রুয়ারী অন্য দিন গুলোর মতই আমার দিন শুরু হয়েছিল। মাত্র তিন দিন আগে, আমি বিয়ে করেছি। আমার ভাইয়ের শালি মানে আমার বেয়াইন, শামিমার সাথে প্রেম করে বিয়ে। আমার এক বন্ধু সালাউদ্দিন। মতলব বাজারে তার ইলেকট্রিক সামগ্রী বিক্রির দোকান আছে। সেদিন সালাউদ্দিন পাইকারী মাল কিনতে মোকাম ‘এ যাবে। নগদ টাকা সাথে নিয়ে ঢাকা যাবে ? তাই আমাকে সাথে নিয়ে নিল। পরদিন ভোরে চলে আসবো, আমিও যেতে রাজী হয়ে গেলাম।

মাল কিনে ফেরার পখে, দু’জন কাচ্চি বিরিয়ানি খেয়েছি। সদর ঘাট এসে লঞ্চে উঠেছি। বাইরে হালকা টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশে বিদ্যুত চমকাচ্ছে।সাথে কিছুটা বাতাসও ছিল। লঞ্চ ছাঁড়ার কথা রাত সাড়ে দশটায়, ছেঁড়েছে পাঁচ মিনিট পর। রিজার্ভ কেবিন নিয়ে বসেছি। আধ ঘন্টা চলার পর, সালাউদ্দিন বললো, চল খুব টায়ার্ড, ঘুমিয়ে পড়ি। আমি বাথরুমে যাবার জন্য, দরজার ছিটকানি খুলতে যাব, অমনি মুহূর্তের মধ্যে লঞ্চটি আচমকা বাতাশে, মাঝ নদীতে উল্টে গেল……….

তিন.

পানির তোড়ে দরজা থেকে ছিটকে ভিতরে চলে এলাম। অন্ধকারে পানি আর পানি। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। অন্ধকারে হাতরে পথ খুঁজে বেড়াচ্ছি। হাতে শুধু কেবিনের তোষক বালিশ লাগছে। কেবিনের জানালার কাঁচ খুঁজে পেয়ে, লাথি দিয়ে গ্লাস ভেঙ্গে ফেলি। ভাগ্যিস গ্রীল ছিল না। কোন ভাবে কেবিনের বাইরে এসে, ঝুঁকি দিয়ে উপরে উঠতে যাব ? লঞ্চের ছাদে ধরাম করে আঘাত পেয়ে, নীচে লঞ্চের ফ্লোরে চলে এসেছি।

শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। সাথে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনবরত কানে মুখে পানি যাচ্ছে । আমি বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছি। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।এখনও স্পষ্ট মনে আছে, বাঁচা মরার সন্ধিক্ষনে, আমার মার মুখটা বার বার মনে পড়ছিল। আমি মা মাগো বলে, মার দোয়া চাইছিলাম। আল্লাহর কাছে প্রান ভিক্ষা চাইছিলাম। তারপর বাবার মুখ! বাবার কাছে মাফ চেয়ে নিচ্ছিলাম। হঠাৎ হাতের কাছে একটা শিঁকল খুঁজে পাই। শিঁকল নিয়ে টানাটানি করতে, মনে হলো কে যেন পিছন থেকে ধাক্কা দিল। ছিঁটকে লঞ্চ থেকে আমি বেরিয়ে এলাম।

চার.

পানির উপরে উঠে যাচ্ছি। হঠাৎ মনে হলো, কে যেন আমার পা ধরে টানছে। হাত দিয়ে দেখি, মেয়ের লম্বা চুল। দু হাতে আমার ডান পা আঁকড়ে ধরে আছে। নিজে বাঁচার জন্য ও শরীরের অতি ক্লান্তিতে, অনেক কষ্টে মেয়েটির আঁকড়ে থাকা দুটি হাত আমি পা থেকে  ছাড়িয়ে দিলাম। প্রায় পানির উপরে উঠে এসেছি, একটি ইট বাহী ট্রলার, আমার বাম দিকের কোমড় ঘেঁষে, শরীরের স্পর্শকাতর জায়গা এবং কোমড়ে প্রচন্ড আঘাত করে চলে গেল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলাম। প্রচুর রক্তক্ষরণ ও ব্যাথা হচ্ছিল।

হঠাৎ কে যেন আমাকে টান দিয়ে কাছে টেনে নিচ্ছে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মূহুর্তে দেখি, বন্ধু সালাউদ্দিন আমাকে টেনে সাঁতরে নদীর তীরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তারপর কিছুই মনে নেই। পরদিন দুপুর আড়াইটায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফিরে। পত্রিকা , টিভি ও লোকমুখে শুনে আমি আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে প্রার্থণা করি, তিনি আমাকে নতুন একটা জীবন দান করেছেন। সেই লঞ্চ দুর্ঘটনায় মতলবের অতি পরিচিতজন সহ, দুইশ ছাব্বিশ জনের মৃত্যু ও আমার বেঁচে থাকা আল্লাহর কারিশমা এবং বাবা মার দোয়া ছাড়া আর কি ?

পাঁচ.

যখন আকাশ মেঘলা হয় ? হালকা বাতাস ছাড়ে ? আকাশে বিদুৎ চমকায় ? আমি ভয় পেয়ে যাই। বাড়িতে যেয়ে মা স্ত্রী ও ছেলের কাছে যেয়ে বসে থাকি। রাতে হলে ভয়ে ঘুমুতে পারি না।আমি একজন ফুটবলার । চাঁদপুর জেলায় সবাই কম বেশি আমাকে চিনে। ফিরে এসে আর ফুটবল খেলতে পারি না। মাঠে যেয়ে বসে অন্যদের খেলা দেখি। শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গে আঘাতের পর আমি সাময়িক যৌন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম। প্রেমিকা স্ত্রীকে বলি, আমার শারিরিক দুর্বলতার কারণে আমাকে ছড়ে চলে যেতে। সে রাজী হয় না। ভালবাসার মানুষটি আমাকে ছেড়ে যায়নি। দিনে দিনে সহযোগিতা করে, সেবা দিয়ে, মনোবল বাড়িয়ে ভাল করার অবিরত চেষ্টা করে, আমাকে ভাল করে তুলেছে। আমি তার ভালবাসার কাছে ঋণী।

ধীরে ধীরে আমি সুস্থ হয়ে উঠি। সময়ের ব্যবধানে যৌন ক্ষমতাও ফিরে পেয়েছি। আমার দুছেলের মধ্যে, বড় ছেলে হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় মারা গেছে। আর ছোট ছেলে আবদুল্লাহর বয়স আঠার মাস। স্ত্রী শামিমা ও ছেলে আবদুল্লাহকে নিয়ে আমার সংসার। জীবন তো আর থেমে থাকে না। কারো জন্য থেমে থাকবেও না । জীবনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছি। চলছে জীবন কোনরকম। মতলব বাজারে ছোট একটা দোকান দিয়ে কোন ভাবে চালিয়ে যাচ্ছি সংসার। আজ কোথায় থাকার কথা ? একটা দুর্ঘটনা আমাকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আমি নামাজ পড়ে, আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করি যে, আমার সন্তান ও আপনজনসহ পৃথিবীর আর কেউ যেন, কোন লঞ্চ দুর্ঘটনায় আমার মত মৃত্যুর স্বাদ না নেয়। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে, দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা যে কি কষ্টের, তা আমিই বুঝি, আমি……………………..

ছয়.

আমি পরে জেনেছি, কি কি কারণে লঞ্চ দুর্ঘটনা হয়। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের অনুমোদনকৃত নকশায় ক্রুটি যদি থাকে ? লঞ্চগুলি যদি অতিরিক্ত যাত্রী এবং বিভিন্ন মাল বহন করে ? অতি প্রাকৃতিক কোন বিপর্যয়ে ? এগুলোর সাথে আম জনতা আমি ? আমার সম্পর্ক কি ? কোন মালিক ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থের জন্য অন্যকে ম্যানেজ করে,স্বীয় স্বার্থ হাসিল করেছেন ! কখনো মানুষকে গরু ছাগল মাল ভেবে অতিরিক্ত যাত্রী/ মাল তুলে নিজের পকেট ভারী করেছেন ! আর প্রাকৃতিক বিপর্যয় ? নিয়তির ব্যাপারে কি বলা যেতে পারে ?

কি এক দুঃসহ জীবন আমি যাপন করছি ? তা শুধু আমি জানি। শারিরিক আঘাত, ভয় ও মানসিক নির্যাতন নিয়ে বেঁচে থাকা ? ওফ আল্লাহ…… আমি যেভাবে বেঁচে আছি ? সেভাবে আর কাউকে যেন বাঁচতে না হয়………….. বাঁচতে না হয়………………..বাঁচতে না হয়……………

 

�����

মন্তব্য
  • বদলে যাও বদলে দাও এপ্রিল 24, 2012 at 8:25 অপরাহ্ন

    শওকত হোসেন বাদল অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার পোস্টটি পড়ে আমি নিজেই সেই লঞ্চের যাত্রী হয়ে গিয়েছিলাম। যেন মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ পাওয়ার অনুভূতি। খুব কষ্ট হচ্ছে যারা লঞ্চ দুর্ঘটনায় এ যাবত পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ এভাবে মৃত্যুবরণ করেছ। তারা প্রত্যেকেই হয়ত এভাবেই বাঁচার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি অনিবার্য মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করতে। আমরা হয়ত এধরনের অপমৃত্যুর! বা সত্য বললে নদীপথে গণহত্যার কোন বিচার করতে পারিনি। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এইধরনের গণহত্যার বিচারিক কোন সুযোগ রাখাই হয়নি। আমরা চাই এইসব বদলে দিতে। শাস্তির বিধান প্রতিষ্ঠিত করতে। জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে। আমাদের কাজ করে যেতে হবে। কোন নেতা, কোন দলের মুখাপেক্ষী হবার সময় ফুরিয়ে গেছে বহু আগেই। আপনাকে আবারও বিনীত ধন্যবাদ জানাই।

    • শওকত হোসেন বাদল মে 1, 2012 at 1:10 অপরাহ্ন

      আপনার মন্তব্যে আমি মুগ্ধ। আপনার উপলব্ধি আমার লেখায় নতুন মাত্রা
      যোগ করবে। আপনার কথাগুলোর সাথে আমি সহমত। শুভেচ্ছা।

© বদলে যাও বদলে দাও