Home » অন্যান্য » এখনই বন্ধ হওয়া উচিত নিঁখোজ সংস্কৃতি

এখনই বন্ধ হওয়া উচিত নিঁখোজ সংস্কৃতি

319 বার পঠিত

৭ দিন হয়ে গেছে, ইলিয়াস আলী আর তাঁর গাড়ি চালককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । আর ৫ দিন আগে প্রথম আলোর রিপোর্ট ছিল, ‘২৭ মাসে সারা দেশে নিঁখোজ হয়েছে ১শ মানুষ’ গায়ে কাঁটা দেয়ার মত তথ্য। এই নিঁখোজ হওয়ার বিষয়টি গত ৩/৪ মাস ধরে সারা দেশের আলোচিত ইস্যু। ইলিয়াস আলী নিঁখোজ হওয়ার পর সেই আলোচনা আরো জোরালো হয়েছে। এর প্রতিবাদে টানা ৩ দিনের হরতালও হয়ে গেলো। আপাত দৃষ্টিতে, সরকার বিব্রত, ক্ষুব্ধ বিরোধী দল ।

কেন মানুষ নিঁখোজ হচ্ছে ? কারা এর জন্যে দায়ী ? এনিয়ে নানা বিতর্ক হচ্ছেই। সেই বিতর্কে যোগ দিচ্ছি না। ইলিয়াস আলীর স্ত্রীর কথাই ধরুন না। দেশ জুড়ে যে এত বিতর্ক এতে কী লাভ তার ? তার সন্তানরা তো বাবার পথ চেয়েই আছে। কিংম্বা তার গাড়ি চালকের কথা ধরুন। যার কথা কেউ সেভাবে বলছে না। তাঁর পরিবারেও কী উদ্বেগ কম ? অথচ ৭ দিন ধরে শুধু নিষ্ফল বিতর্কই হলো। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাই হচ্ছে। ফলাফল শুণ্য। একটা স্বাধীন দেশ থেকে একটা জলজ্যান্ত মানুষ হাওয়া হয়ে যাবে ! এর চেয়ে বড় অসভ্যতা আর কী হতে পারে  ? আমি জানিনা কী লাভ এত বিজ্ঞান এত প্রযুক্তির কথা বলে।

একজন ইলিয়াসই শুধু নয়। আমাদের দেশে এই নিখোঁজ হওয়া অপ-সাংস্কৃতির ভিত শক্ত হচ্ছে । এতে সাধারণ মানুষ হিসাবে আমি আতংকীত। যে কোন মানুষের বিরোধিতা করার মত নানান স্বীকৃত বিপক্ষ তো আছেই। এছাড়াও পদ্ধতিগত দুর্বলতার সুযোগে যে কোন মুহুর্তে তার সামনে নতুন বিপক্ষ সৃষ্টি হচ্ছে। যেহেতু কোন মানুষ নিঁখোজ হলে দায় চাপানোর মত শক্ত ঘাড় পাওয়া যায়। এবং এর কোন সুরাহা না হওয়াটাই নিয়ম। সেহেতু এই সুযোগ নিতেই পারে কোন অপ-শক্তি। অথবা চতুর্থ অপশক্তি হিসাবে ব্যক্তি নিজেই আবির্ভুত হতে পারেন। যে কোন দায় এড়াতে লুকিয়ে রাখতে পারেন নিজেকে। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কী এই অপ-সংস্কৃতির মধ্যেই থাকবো ? না এই জাল ছিড়ে বের হয়ে আসার চেষ্টা করবো ?

কোন মানুষ নিঁখোজ হলে শুরুতে সন্দহের আঙ্গুল তোলা হয় আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন শাখার দিকে। তা সেটা প্রমাণিত হোক অথবা না হোক । অবশ্য এর যে যুক্তিসংগত কারণ নেই তা বলছি না। সেসব কারণ জানে মানুষ। এনিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয় নিয়মিত। তাই সেই কারণ বিশ্লষণে যাচ্ছি না। শুধু বলছি, সাধারণ মানুষ আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে ভয় পায়। নেহাত জরুরি না হলে ও পথ মাড়াতে চায় না কেউই। কিন্তু এমন কী হওয়ার কথা ?

এই ভয় কাটানো টা জরুরি। এর জন্যে সবার আগে যেটা দরকার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কন্নয়ন। যে কোন বিপদে কোন বাহিনী কী ভাবে মানুষকে সহায়তা দিতে পারে তা সাধারণ মানুষের জানা। এর জন্যে গণ মাধ্যমের সহায়তা নিতে পারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যেহেতু সন্দেহের তীর টা তাদের দিকে ছোড়া হয় শুরুতে, সেহেতু প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের স্বচ্ছ রাখতে পারেন তারা। যেমন কোন লোককে যদি আটক করতে হয় তা করা উচিত যতটা প্রকাশ্যে সম্ভব।  অন্তত ৩ জন মানুষের কাছে বলা উচিত যে এই লোকটিকে কেন আটক করা হচ্ছে ? এর পরের পদক্ষেপ কী ? আর সরকার পারে এটিকে একটি নিয়মে পরিণত করতে।

সরকারের প্রসঙ্গ যখন আসলোই তখন একটু আলোচনা করে নেয়া যায় যে মানুষের নিখোঁজ হওয়া বন্ধে কী ভূমিকা নিতে পারে সরকার। এটা খুবই স্বাভাবিক যে, রাষ্ট্রের যে কোন সাফল্য এবং ব্যার্থতা দু’টিরই অংশীদার সরকার। এই সত্য মেনেই তারা দেশ চালানোর দায়িত্ব নেন। কাজে কাজেই দেশে এই নিঁখোজ হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ার যে ব্যার্থতা এর দায় কোন ভাবেই এড়াতে পারে না সরকার । বর্তমান সরকার কেন, কোন সরকারই পারতোনা। অনেকে অনেক কথা বলেন। কিন্তু আমি খুব সহজ করেই ভাবতে চাই। বলতে চাই, কোন সরকার সরসরি মদদ দিয়ে দেশে এমন অরাজকতা ডাকবে না। বিশেষ করে জনগণের ভোট নির্ভর গণতান্ত্রিক সরকারগুলো। যে কারনে সরকারেরও উচিত সবকিছুতে স্বচ্ছ থাকা। তথাকথিক ভাবমুর্তির কথা না ভেবে ভাবা উচিত মানুষ ও মানুষের জীবন নিয়ে । যে কোন কিছুর আগে মানুষের জীবন।

অবশ্য সব কিছুর আগে সাবধান হওয়া উচিত । একটা ভয়ঙ্কর অপরাধের ভাইরাস ঢুকে পড়েছে আমাদের সমাজে। সাবধান না হলেই নয়। এক্ষেত্রে সব চেয়ে সহায়তা দিতে পারে প্রযুক্তি। গুগল আর্থের ব্যবহারকে আরো শানিত করতে পারলে কোন অপরাধই আন্তজালের বাইরে হওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া মোবাইল প্রযুক্তিও ব্যবহার করা যেতে পারে । প্রতিটি মোবাইলফোন থেকে বিপদ সংকেত পাঠানোর ব্যবস্থা থাকা উচিত সরকারের বিশেষ কোন দপ্তরে। যে সংকেতের মাধ্যমে অন্তত বোঝা যায় লোকটি কোথায় কী ধরনের বিপদে পড়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রযুক্তি অপব্যবহারের আশংকা আছে।কিন্তু অপব্যবহারের কারণে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ হবে।

তবে ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি মানুষ মানুষকে যতটা নিরাপত্তা দিতে পারে আর কেউ সেটা পারে না। সাধারণ মানুষ মানুষ সোচ্চার হলেই সবচেয়ে দ্রুত পালাবে এই ‘নিখোঁজ’ ভাইরাস। একটা প্রত্রিকায় পড়লাম , ইলিয়াস আলী যে রাতে নিখোঁজ হন সে রাতে বাড্ডার একটি মার্কেট এসে পালান ২ ব্যক্তি। পরে তাদের একদল মোটর সাইকেল আরোহী ধরে নিয়ে যায়। পালাতে আসা ওই দুই ব্যক্তির বিবরণ ইলিয়াস আলী ও তার চালকের চেহারার সঙ্গে মিলে যায়। পত্রিকার রিপোর্ট অনুয়ায়ী কয়েকজন শ্রমিক এগিয়ে আসার চেষ্টা করলেও অস্ত্র দেখে পিছিয়ে যায় তারা। কিন্তু ওই কয়েকজনের সঙ্গে আরো কয়েকজন যদি যুক্ত হতেন তাহলে কিন্তু অস্ত্রধারীরাই পালাতো। নাহলে কারা ইলিয়াস আলীকে নিয়ে যাচ্ছে সেটা অন্তত জানা যেতো। সাধারণ মানুষের শক্তির চেয়ে বড় শক্তি কী আর কিছু আছে ? আমি তো মনে করি নিখোঁজ হওয়া কেন, যে কোন অপতৎপরতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হলে। তবে সেটা যেন নিয়মতান্ত্রিক হয়। ‘আইন হাতে তুলে নেয়া’ না হয়।

প্রথম আলোর দর্শনের কাছে ফিরতেই হচ্ছে। “উট পাখি নয় মানুষের জীবন চাই” কারণ আমরা বেশিরভাগ মানুষই উট পাখির জীবন যাপন করি। সেদিন রাতে যদি মধ্য বাড্ডার মুসা মার্কেটে অমন ঘটনা ঘটেই থাকে তাহলে কেন এত দেরিতে প্রকাশ হলো ? পর দিন সকালেই যদি বিষয়টা জানা যেত, তাহলে যারা এই নিঁখোজের ঘটনা তদন্ত করছেন তাদের নিশ্চই কিছু লাভ হতো । যে কোন মুল্যে এই হঠাৎ করেই  নিঁখোজ হওয়াটা বন্ধ হওয়া উচিত তা তিনি যে দলের বা মতেরই হোন । আর এজন্যে সাধারণ মানুষও যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারেন। ছোট্ট একটা দেশ। বেশিরভাগ মানুষের যদি চোখ কান খোলা থাকে, তাহলে  কারো না কারো কাছে অস্বাভাবিকত্ব ধরা পড়বেই। আর এটাই হতে পারে নিঁখোজ মানুষটিকে খুঁজে বের করার ক্লু।একটি ঘটনায় অপরাধীরা ধরা পড়লে অন্য ঘটনাগুলো কমে আসবে। এক সময় বন্ধ হয়ে যাবে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা অবকাঠামো দুর্বল হলে এর চেয়ে ভাল সমাধান আর কী বা হতে পারে ?

মন্তব্য
  • masud khan এপ্রিল 28, 2012 at 9:27 পূর্বাহ্ন

    খুভ ভালো লিখেছেন । ধন্যবাদ ।

  • পলাশ আহসান এপ্রিল 27, 2012 at 11:46 পূর্বাহ্ন

    লেখাটি যারা পড়েছেনে তাদের প্রতি অঢেল শ্রদ্ধা। আর যারা মন্তব্য করেছেন তাঁদের প্রতি আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ । এত বড় সমস্যার সমাধান দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। সেটা চাইও নি। আমি আসলে একটা সূত্র খোঁজার চেষ্টা করেছি। আমাদের আইটি বিশেষজ্ঞ বন্ধুরা নিশ্চই অনেক ভাল সমাধান বের করতে পারবেন। আসুন সবাই মিলে নিখোঁজ মানুষ খোঁজার এবং নিখোঁজ হওয়া বন্ধের উপায় বের করি। সেটি কার্যকর আমরা করতে পারবো না ঠিকই। কিন্তু যাদের হাতে সে দায়িত্ব আছে তাঁদের কাছে পৌঁছাতে তো পারবো।

  • korikathure এপ্রিল 26, 2012 at 8:59 অপরাহ্ন

    ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার গুরুত্তপূর্ণ ধাপ হতে পারে আপনার প্রস্তাবনা । খুব গুছিয়ে লিখেছেন । ধন্যবাদ আপনাকে ।

  • Al Masud এপ্রিল 26, 2012 at 5:50 অপরাহ্ন

    আপনার প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসঙ্গ টা ভাল লাগল। সরকারের উচিত ছিলো এরকম সুবিধা আরো আগে দেশে ব্যবহার করা। সরকার তো ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বলে ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু ডিজিটালের কিছুই করেনি। আর করবে কিভাবে- ওরা এখন ব্যাস্ত টাকার ভাগাভাগি নিয়ে আর আবার ক্ষমতায় আসবে কিভাবে সেই পরিকল্পনাই করছে মনে হয়ে….

  • সাআখান এপ্রিল 26, 2012 at 4:06 অপরাহ্ন

    খুব সুন্দর করে গুছিয়ে লিখেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো। খুব ভালো লেগেছে আপনার প্রস্তাবটি – মোবাইল প্রযুক্তি। এর ব্যাবহার সঠিক ভাবে হলে হয়তোবা অনেক অপরাধীকেই অতি দ্রুত আয়ত্তে আনা সম্ভব হবে।

  • Qazi Manzur Karim (কাজী মিতুল) এপ্রিল 26, 2012 at 2:27 অপরাহ্ন

    “প্রতিটি মোবাইলফোন থেকে বিপদ সংকেত পাঠানোর ব্যবস্থা থাকা উচিত সরকারের বিশেষ কোন দপ্তরে। যে সংকেতের মাধ্যমে অন্তত বোঝা যায় লোকটি কোথায় কী ধরনের বিপদে পড়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রযুক্তি অপব্যবহারের আশংকা আছে।কিন্তু অপব্যবহারের কারণে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করলে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ হবে।”
    -আপনার এই প্রস্তাবটি দারুণ লেগেছে আমার। উন্নত দেশে পুলিশকে ফোন করার জন্যে হটলাইনটা খুব কার্যকর। এদেশে সে আশা নিষ্ফল। তবে র‌্যাবকে SOS জাতীয় call বা SMS করার একটা সংস্কৃতি অনতিবিলম্বে শুরু হতে পারে (যদি সরকার চায়)।

© বদলে যাও বদলে দাও