Home » অন্যান্য » ‘তুই ভারতের দালাল’, ‘তুই পাকিস্তানের দালাল’!

‘তুই ভারতের দালাল’, ‘তুই পাকিস্তানের দালাল’!

191 বার পঠিত

= মীর আবদুল আলীম =

‘তুই ভারতের দালাল’, ‘তুই পাকিস্তানের দালাল’! সেদিন মহল্লার চায়ের দোকানে আওয়ামী এবং বিএনপি সমর্থকের মধ্যে এ ধরনেরই কথা কাটাকাটি চলছে। বিষয়টিতে কৌতূহলী হলাম। কারণ দেশে ‘দালাল’ এখন বেশ আলোচিত সমালোচিত বিষয়। গরুর দালাল, জমির দালাল এ পর্যায়ে এখন আর নেই দালালি। তা আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আর যাদের দালাল হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে তারাও দেশের নামিদামি জন। দালালের সম্মান আর মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হালে দালালের সংক্ষিপ্ত নামকরণও হয়েছে। ভাদা (ভারতের দালাল), পাদা (পাকিস্তানের দালাল)। বিষয়টি বেশ চমৎকার, তাই না? দেশে এ দুই শ্রেণীর দালাল আছে; কিন্তু বাদা (বাংলাদেশের দালাল) নেই। থাকলেও বাংলাদেশের দালালদের নিয়ে আলোচনা নেই। পাঠক নিশ্চই বুঝে গেছেন কোনো দালালের কথা বলছি আমি। রাজনৈতিক দালাল। আমাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে দালাল শব্দটি সর্বাধিক আলোচিত। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের দালাল বলে আখ্যা দিয়ে গলা ফাটাচ্ছেন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কম যাচ্ছেন না। তিনি খালেদা জিয়া এবং বিএনপিকে ভারতের দালাল বলে সভা-সমাবেশে বোমা ফাটাচ্ছেন প্রায়ই। পাদা ভাদার চাপে কান ঝালাপালা হওয়ার জো হয়েছে আমজনতার।
বাংলাদেশে ভারতীয় দালাল আছে, পাকিস্তানি রাজাকার আছে, সৌদিপন্থী, চীনাপন্থী, মার্কিনপন্থী লোকজনও আছে, শুধু ১৬ কোটি মানুষের দেশে ‘বাংলাদেশপন্থী’ কেউ কি নেই ? অনেককেই আজ ভারতের দালাল, পাকিস্তানের দালাল বলতে শুনি, অথচ কাউকে বাংলাদেশের দালাল বলতে শুনিনি। কিন্তু কেন? তাহলে বাংলাদেশের দালালি করবার মতো কি কেউ নেই? দেশপ্রেমিক লোক কি একজনও দেশে নেই? এটা অত্যন্ত লজ্জার। আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪১ বছর। কিন্তু আমরা কেউ আজ ও দেশের সঠিক দালাল হতে পারিনি। আমরা ভারতের দালাল হয়েছি কিংবা পাকিস্তানের দালাল হয়েছি; কিন্তু নিজের দেশের জন্য দালাল হতে পারিনি। আর সেই কারণে আজও আমরা আমাদের সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। আসলেই কি আমরা দেশের জন্য কিছু করেছি কিংবা করতে পারছি? দুর্নীতিতে পরপর পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ধরে রাখায় এমনিতেই খ্যাতি জুটেছে ‘চোরের জাতি’ হিসেবে। এখন নেতা-নেত্রীদের বদান্যতায় সব দিক থেকে দেউলিয়াত্বের খাতায় নাম লেখাতে চলেছি! শেষ পর্যন্ত আমরা একটা ‘দালালেরও’ জাতি হলাম! বাংলাদেশের দালালি নিয়ে বিদেশের পত্রপত্রিকাগুলোও লিখছে; তা পড়ে হাসছে বিশ্ববাসী। আসলে আমাদের নেতা-নেত্রীরা যে কি মনে করেন দেশটাকে! আমাদের নিজেদের না হয় মানসম্মান নেই বুঝলাম, তাই বলে দেশটার কোনো ইজ্জত থাকতে পারে না! রাজনীতিকদের কেউ কেউ না হয় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি জ্ঞান করে দেশটাকে অবাধ লুটপাটের চারণভূমিতে পরিণত করেছেন, তারপরও এ জনগোষ্ঠী তো একটি জাতিসত্তা। বাংলাদেশী পরিচয়ে আমরা একটি জাতি। তার ন্যূনতম মানসম্মানটাও থাকবে না? আমাদের প্রধান দুদলের নেত্রী একজন বলেন ও ইন্ডিয়ার টাকা খায়! অন্যজন বলেন ও পাকিস্তানের টাকা খায়! এ বলে ও ‘পাকিস্তানের দালাল’ ও বলে এ ‘ভারতের দালাল’! দুই প্রধান রাজনৈতিক দল গত বেশ কিছুকাল ধরেই বিদেশের টাকা খাওয়া নিয়ে এ ওর দিকে আঙুল উঁচিয়ে রেখেছেন। এ যেন সেই এ বলে ‘তুই চোর’ ও বলে ‘তুই চোর’।
সে দিন একটি বক্তৃতা শুনে চমকে উঠেছি! এশিয়া কাপের ফাইন্যালের দিন মাঠে যদি না যেতেন খালেদা জিয়া! এর আগে মোহাম্মদ নাসিমও এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন। গুরুত্ব পায়নি। শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর সেটিকে গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানের দালাল বলে আখ্যা দিয়েছেন। দেশের বিরোধীদলের নেত্রী সম্পর্কে তিনি এমন আপত্তিকর বক্তব্য জনসমুক্ষে দিতে পারেন না। অবশ্য বিরোধীদলীয় নেত্রীও এমনটা করেন না তা নয়। হরহামেশাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের দালাল; ভারতের দালাল বলে গলা ফাটান। এতোকাল ঢিল মেরেছেন তাই পাটকেলটিও তাকে খেতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা আসলে আমরা সবাই দালাল? দালালে দালালে ভরে গেছে দেশ। কেউ সরকারের আবার কেউ বিরোধীদলের কেউ ভারতের কেউ পাকিস্তানের কেউ আমেরিকার কেউ রাশিয়ার?
আমাদের সম্মানিত দুই নেত্রীকে পাকিস্তানের টাকা খেলেন আর কে ভারতের টাকা খেলেন তা খুঁজে বের করার বিষয়। খুঁজতে থাকুন কে কতোটা খেলেন। কিন্তু আমরা যারা আম পাবলিক কি দোষ করেছি আমরা! জাতির ললাটে কেন আপনারা দালাল হিসেবে কলঙ্ক তিলক সেঁটে দিচ্ছেন? প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলই যদি এ ওর বিরুদ্ধে বিদেশের দালালির অভিযোগ তুলতে থাকেন তাহলে কি ধরে নিতে হবে না দেশের রাজনীতি স্বাধীন সত্তা হারিয়েছে। তাতে জাতি হিসেবে আমাদের মানমর্যাদা বলে আর কিছু থাকে না। গোটা দেশটাই দালালের জাতি হয়ে যায়! বিদেশের দালালি কখনো দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। আমরা আর বাংলাদেশে বিদেশের কোনো দালাল চাই না। দোহাই নেতা-নেত্রীরা, ভারত পাকিস্তানের দালালি বাদ দিয়ে বাংলাদেশের দালালিতে নামুন। ৪১ বছর পার করলাম, আর কতো জাতিকে লুলা-ন্যাড়া করে রাখবেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারি দলের আতি পাতিদের মুখে খই ফুটতে লাগলো। প্রধানমন্ত্রী তো বিরোধীদলীয় নেত্রীকে বাংলাদেশ ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যেতেই বললেন। কত দিন চলতে থাকবে এ কোরাস আল্লাহই মালুম। প্রমাণহীন দোষারোপ ও চরিত্রহরণের রাজনীতি এরই মধ্যে দেশের মানুষকে যথেষ্ট বিপর্যস্ত করেছে। নোংরা আক্রমণের পাশাপাশি বড় দুটো দলের কে কোন দেশের টাকা খেয়ে নির্বাচন করেছে এসব বিতর্ক অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতির দৈন্য আরো প্রকট হয়ে উঠবে।
সত্য কথা বলতে কি আমর বাঙালি পাকিস্তানের কৃতকর্মের জন্য তাদের সাড়া জীবনই ঘৃণা করে যাবো। বিরোধীদলীয় নেতার বিরুদ্ধে পাকিস্তান প্রীতির অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা সে ব্যাখ্যায় আপাতত না যাওয়াই ভালো। তবে যেহেতু দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী এমন অভিযোগ তুলেছেন সে ক্ষেত্রে যদি কারো পাকিস্তানপ্রীতি থেকে থাকে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের ওপর তাদের অত্যাচারের কথা কেউ ভুলে যেতে পারেন আমরা দেশবাসী তা পারি না। আর ভারতের কথা কি আর বলবো। এটা তো আমজনতা আমার চেয়েও ভালো জানেন। সীমান্তে কুকুরের মতো মানুষ মারছে। ফেলানীর কথা এতো সহজে ভুলে কি করে বাঙালি? ফারাক্কা, টিপাইমুখে বাঁধ সবকিছুই তো আমরা জানি। ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে হত্যা করেছে পদ্মাকে। অভিন্ন ৫৪টি নদীতে দিয়েছে বাঁধ। বিনষ্ট হয়েছে পরিবেশ। মরে গেছে শত শত নদী। এখন টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে শুকিয়ে মারতে চাচ্ছে সুরমা, কুশিয়ারা, মেঘনাকে। আদায় করে নিয়েছে করিডোর। এশিয়ান হাইওয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে ভারতের প্রেসক্রিপশন মতো। সীমান্তে বিনাবিচারে প্রতিদিন পাখির মতো গুলি করে মারছে বাংলাদেশীদের। লাশ ঝুলিয়ে রাখছে কাঁটাতারে। সীমান্তের ওপার থেকে বাংলাদেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের জন্য শতাধিক ফ্যাক্টরিতে ফেনসিডিল তৈরি করে পাঠিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের ভেতরে। গরু চোরাচালানি কিংবা সাধারণ কৃষক বিএসএফের গুলিতে মারা গেলেও আজ পর্যন্ত কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে তারা হত্যা করেনি। কাঁটাতার দিয়ে একটি বন্ধু দেশকে খাঁচার মধ্যে পশুর মতো আটকে রেখে দাবি করছে বন্ধুত্ব।
প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভারত পাকিস্তানপ্রীতির অভিযোগ তা যদি সঠিক না হয় তাহলে দেশের জন্য মঙ্গলই বৈকি। আর যদি সত্য হয় তাতে সাপোর্ট করার সুযোগ নেই তাতে। ভারত কিংবা পাকিস্তান কারা কতোটুকু বাংলাদেশপ্রেমী তা তো দেশবাসী হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছে। পাকিস্তান আমলে ছিলাম পরাধীন; স্বাধীনতা পেয়েও ৪১ বছরে আমরা আজ কতোটা স্বাধীন? এখনো স্বাধীনতাটাকেই তো আমাদের খুঁজে ফিরতে হয়। স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ আমরা তবে কেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারছি না। তবে কেন টু শব্দটিও করতে পারছি না আমরা। ভারতের ইচ্ছা হচ্ছে টিপাইমুখে বাঁধ দেবে। বাংলাদেশের কি হবে; শুকিয়ে কাঠ হবে কি পানি না পেয়ে মানুষ মরবে তা দেখার দরকার নেই ভারত সরকারের। আমাদের ভালো মন্দ কিংবা চাওয়া-পাওয়ায় এস যায় না ভারতের। যেমনটি হয়েছিল ফারাক্কার বেলায়। ভারতীয় সীমান্তে মানুষ মারা হচ্ছে কুকুর-বিড়ালের মতো করে। আমাদের দেশে বোধ করি ইচ্ছা করে এক কুকুর বিড়ালও মারা হয় না। একের পর এক লাশ পড়ছে। কতোটুকু প্রতিবাদ করতে পারছি আমরা। স্বাধীন দেশে ভারতীয় আগ্রাসন তো চলছেই। তবে কেন ভারতপ্রীতি? প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেদা ক্ষমা করবেন। আমি কিন্তু একবারের জন্যও আপনাদের ভারত কিংবা পাকিস্তানের দালাল বলছি না। বলবও না। এতো দুঃসাহস দেখাই কি করে। আপনারা সাচ্ছা বাঙালি; সাচ্ছা দেশপ্রেমী। আপনারাই তো বলেন, ওমক ভারতের আর ওমক পাকিস্তানের দালাল। তাই আমাদের মুখফুটে কিছু বলার দরকার পারে না খুব একটা। এরা যদি চলে পাকিস্তানের টাকায় ওরা যদি চলে ভারতের টাকায়, তার অর্থ দেশের রাজনীতিকরা সবাই বিদেশের দালাল! পক্ষ তো দুটাই, এরা আর ওরা। যে জাতির নেতা-নেত্রীরা ‘বিদেশের দালাল’ হয় সে জাতির ভাবমূর্তিটা কোথায় গিয়ে ঠেকে একবার বুঝবেন না! এ যে এক দল বলছে ওরা ‘ভারতের বস্তা বস্তা টাকায় ক্ষমতায় এসেছে’ প্রতিপক্ষরা জবাবে বলছে ‘ওরা পাকিস্তানের টাকায় নির্বাচনে জিতেছে’Ñ অর্থ কি দাঁড়ালো? দুদলই বিদেশের টাকাখোর! বিদেশের টাকায় যখন এরা ক্ষমতায় আসে তাহলে বিদেশের স্বার্থেই এরা কাজ করে! যদি আপনাদের ভারত কংবা পাকিস্তান প্রীতি থেকেই থাকে তবে ফিরে আসুন এ পথ থেকে। দেশবাসীর অনেক প্রত্যাশা আপনাদের কাছে। বন্ধু দেশ; শত্রু রাষ্ট্র বহু দেখেছি। কে কতো বড় বন্ধু তার প্রমাণ পাকিস্তান আমলে যেমন পেয়েছি, এখনো পাচ্ছি। তাই কালক্ষেপণ না করে বাংলাদেশপ্রীতিতে ফিরে আসুন; বাংলাদেশের দালাল হোন!
মন্তব্য
  • Mir Abdul Alim মে 2, 2012 at 7:56 অপরাহ্ন

    ‘তুই ভারতের দালাল’, ‘তুই পাকিস্তানের দালাল’!

    Mir Abdul Alim

    = মীর আবদুল আলীম = ‘তুই ভারতের দালাল’, ‘তুই পাকিস্তানের দালাল’! সেদিন মহল্লার চায়ের দোকানে আওয়ামী এবং বিএনপি সমর্থকের মধ্যে এ ধরনেরই কথা কাটাকাটি চলছে। বিষয়টিতে কৌতূহলী হলাম। কারণ দেশে ‘দালাল’ এখন বেশ আলোচিত সমালোচিত বিষয়। গরুর দালাল, জমির দালাল এ পর্যায়ে এখন আর নেই দালালি। তা আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আর যাদের দালাল হিসেবে

    বিস্তারিত..

© বদলে যাও বদলে দাও