Home » অন্যান্য » আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়,সুবিধাভোগী শ্রেণী এবং শিক্ষার গুষ্টিউদ্ধার

আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়,সুবিধাভোগী শ্রেণী এবং শিক্ষার গুষ্টিউদ্ধার

336 বার পঠিত

কোন এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তিন মাস পরে ক্লাস নিতে এসে শিক্ষার্থীদের কাজে জানতে চাইলেন আগের দিন কোথায় শেষ করছিলেন। শিক্ষার্থীরা ঠিকমত মনে করতে  না পারায় তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং তাদেরকে মনের সুখ মিটিয়ে তিরস্কার করলেন! দোষতো অবশ্যই শিক্ষার্থীদের। কারণ তারা তো সেই শিক্ষকের ক্লাসের শিডিউল অনুযায়ী প্রতিদিনই এসে অপেক্ষা করেছে; শিক্ষক শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও দশটি দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় নিজের প্রধান দায়িত্বের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছেন! শিক্ষার্থীদের যেহেতু তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই, সেহেতু তিন মাস কি আট মাস পরে এসে আগের ক্লাসের কোথায় শেষ করেছিলেন এতটুকু বলতে না পারা অপরাধ বৈতো কিছুই নয়!

শিক্ষার্থীরা বসে অপেক্ষা করছে ক্লাসের জন্য,শিক্ষককে ফোন করেও পাওয়া যাচ্ছে না;শিক্ষার্থীরা চলেও যেতে পারছে না….কারণ ক্লাস হবে না এ ধরনের কোন নির্দেশওতো তাদের দেয়া হয়নি,তবে! প্রায় তিন ঘন্টা পরে তাঁকে পাওয়া গেল ফোনে। তিনি ঘুম থেকে উঠতে দেরী করেছেন তাই ক্লাসে আসতে পারবেন না!!!

পিএইচডি ক্লাসে একজন শিক্ষক এসে প্রথমেই জানালেন এই ক্লাসের জন্য তো তাঁকে আলাদাভাবে কোন ‘টাকাপয়সা’ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেয়া হয়না,কাজেই ক্লাস বিষয়ে তাঁর দায়দায়িত্ব নেই বললেই নাকি চলে!তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন সপ্তাহে একদিন কি দু’দিন,তাই তাঁর সুবিধামত দিন ছাড়া ক্লাস নেয়াও তাঁর জন্য সমস্যাজনক!এজন্য কর্মজীবী উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী মেধাবী শিক্ষার্থীদের চাকরী ছেড়ে দিয়ে না পড়লে তাঁর সাথে তাল মেলানো হয়তো সহজ নয়।আর চাকরী যখন বেশিরভাগ মানুষের করারই প্রয়োজন তাই  এক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ থাকাটাই বোধকরি ভীষণ অপ্রয়োজনীয়।

সামনেই কোন এক ব্যাচের ফাইনাল পরীক্ষা।কিন্তু এখনও একটি কোর্স শুরুই হয়নি;কারণ শিক্ষক নিজেকে বেশ বয়োজোষ্ঠ্য ভাবছেন এবং বছরে এক আধদিন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার প্রয়োজনবোধ করছেন না।এই শিক্ষককেও দায়িত্বহীণ ভাবার কোন কারণ নেই,কারণ তিনি পরীক্ষার আগের এক সপ্তাহে অবশ্যই দু’ঘন্টার দু’টি ক্লাস নিয়ে সারা বছরের কোর্স দু’দিনেই শেষ করে দেন।

গত বছর কি তার আগের বছরের কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আত্মহত্যা করেছিল সেশনজটের বোঝা বইতে না পেরে।কারণ তার কৃষক পিতাকে সে আর কষ্টের বোঝা বইতে দেখতে সহ্য করতে পারছিল না।সবার স্বপ্ন ছিল ছেলে একদিন বড় হবে,তাঁদের দুঃখ দূর করবে।

এভাবে ঘটনা বলতে শুরু করলে তার আর শেষ হবে না।কিন্তু কেন ঘটছে এসব,কি কাজে শিক্ষকরা এত ব্যস্ত?আপনার যেকোন ধরনের শক্তিই আপনার ক্যারিয়ারে উন্নতির সহায়।আপনার অর্থ বল রয়েছে ;আপনি সরকারী দলের সমর্থক; আপনার বাবা বা মা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাশালী পদাধিকারী ব্যক্তি অথবা আপনি অত্যন্ত পা চাটা গোছের মানুষ……বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার এবং আপনার আত্মীয়স্বজন সবার চাকরীই নিশ্চিত। আপনি অবশ্যই আপনার নিম্মমানের অনার্স বা মাস্টার্সের রেজাল্ট নিয়ে একদমই চিন্তিত হবেন না। প্রভাষক পদে ঢুকে মাসিক বেতন নিশ্চিত করেই আপনাকে বেরিয়ে পড়তে হবে সুবিধার খোঁজে।অতন্ত আনন্দের বিষয় এই যে,স্কুলের শিক্ষকদেরও কষ্ট করে বিএড বা এধরনের পরীক্ষা দিয়ে নিজেদের পদোন্নতির ব্যবস্থাকে সহজ করতে হয় (রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ব্যতিত);দিনে অন্তত ছয়টা ক্লাস তো নিতে হয়ই। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা শুধুমাত্র ক্ষমতাবলেই নিয়োগ পেয়ে যান উচ্চশিক্ষা দেবার মত এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে।

নিয়ো পাবার একমাসের ভেতর তারা যেকোন একটি হলের প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত হবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন। কেন? কারণ কোন হলের প্রশাসনিক দায়িত্ব পেলে তিনি একটি সুন্দর বাসা পাবেন,হলের শিক্ষার্থীদের ফিস্টের খাবারের অংশ বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন,একটি টেলিফোন পাবেন ইত্যাদি ইত্যাদি।এরপর আরও দায়িত্ব নিতে হবে নইলে বিশ্ববিদ্যালয় তো অচল হয়ে যাবে! কারণ এখানে তো প্রশাসনিক কোন কর্মকর্তাই থাকেন না প্রশাসনকে সামলানোর জন্য;শিক্ষকরা ছাড়া এত শিক্ষিত আর কে আছে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও সামলাতে পারে?প্রবীণ শিক্ষকরা ৪/৫ টি করে দায়িত্ব পান;কেউ বা বেশি ক্ষমতাশালী হলে  ৮-১০টি (বিভাগের সভাপতি,গ্রন্থাগারের প্রধান,হলের প্রাধ্যক্ষ,ফ্যাকাল্টির ডিন ইত্যাদি) দায়িত্বের বোঝা নিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ধারের কাজে নামেন। নানান ধরনের সংস্কারের তখন প্রয়োজন পরে,বাজেটে অনেক অর্থ বরাদ্দ হয় তার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিষয়াবলীর সংস্কারের জন্য! পরবর্তীতে আবারও তাঁর মতই অন্য একজন দায়িত্বে আসেন,আবারও সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে! হলের দায়িত্বে থাকলে তো পোয়া বারো। হলের সকল কর্মচারীকে নিজের বাসার সকল কাজের জন্য অলিখিত নিয়োগের সুবিধা পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে অবশ্য এই ক্ষমতাটি দেখান দায়িত্ব প্রাপ্তের স্ত্রী বা স্বামীর!তাঁর দাপট তো আরও বেশি,অপরিসীম! সেই দাপটের ভেতর খেই রাখাই তো মুসকিল!

এতো গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডীর মধ্যের কথা…….এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ভাঙ্গিয়েই তাঁরা পান প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা দেবার সুযোগ ; বেসরকারী নানা প্রতিষ্ঠানে সম্মানের সাথে  নানা পদে দাখিল হওয়ার সুযোগ……..এক কথায় বিশাল পরিমানে অর্থ জমানোর ‘বৈধ’ সুযোগ।

এসব কাজের ভীড়ে তাঁরা নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সময় দিতে অপারগ হয়ে পড়েন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদন্ডই আলাদা যা সর্বদাই আলাদা গুরুত্ব পায়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ কি হচ্ছে?? প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে পড়েছে।সেই অচলতা কোথাও দৃশ্যমান,আবার কোথাও হয়তো অদৃশ্য।বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ‘হটাও’ আন্দোলনে যে পরিমান উৎসাহ নিয়ে প্রতিটি স্তরের শিক্ষকের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়,হায় তা যদি শুধু ক্লাস রুমে দেখা যেত!!এমনকি যে শিক্ষক নানাবিধ ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কাজে ব্যস্ত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নিয়মিতভাবে অনিয়মিত’, তাদের নিয়মিত উপস্থিতি পর্যন্ত এ ধরনের আন্দোলনের প্রাণকে সঞ্চার করে!!!সবচেয়ে অদ্ভূত বিষয় এই যে এসব কোন বিষয়ই সরকারকে চিন্তিত করে না,বিপর্যস্ত করে তোলে না।আমরা ঠিক কোন সময়ে কি অবস্থায় অবস্থান করছি…যেখানে শিক্ষা হয়ে গিয়েছে সুবিধাভোগীর আশ্রম….যারা শিক্ষার গুষ্টি উদ্ধারে বিশেষ পারদর্শী। বাবা-মা কত কষ্ট করে পড়তে পাঠায়,শিক্ষার্থীরা নিজেরাও টিউশনি করে বা নানা পার্ট টাইমকাজ করে নিজেদের পড়াশুনা চালায়….না নেই কোন ভ্রুক্ষেপ কারও….না সরকারের না শিক্ষাগুরুদের……

সকলেই শুধু আন্দোলন করে যাচ্ছে…..আন্দোলনকে পতিশীল করার পরিকল্পনা করছে……কে কাকে  কিভাবে ফাসাতে পারে তার পরিকল্পনা হচ্ছে…..পড়ে থাকছে দেশের মেধাবী ছেলেমেয়েগুলো যাদের ওপরেই আসলে দেশের এগিয়ে যাওয়া নির্ভর করে আছে।

মন্তব্য
  • বদলে যাও বদলে দাও এপ্রিল 29, 2012 at 10:03 অপরাহ্ন

    Eshita Binte Shirin Nazrul আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যয়ে শিক্ষা দানের বাস্তব একটি তুলে ধরার জন্য। আমরা দেখি গ্রামের নিরক্ষর একজন মানুষকে যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায়, কিন্তু শিক্ষিত মানুষদের বোঝানো যায় না। এঁরা রাষ্ট্রের প্রকৃত জ্ঞানপাপী। এঁরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চমাত্রার প্রতারণা পৌছেঁ দিয়েছেন এবং স্থায়ীত্বও দিতে পেরেছেন। চ্যান্সেলর-এর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করে এদেঁরকে বিশ্ববিদ্যায় থেকে বহিষ্কার করা জরুরি। আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে রাষ্ট্রে এমন একটি প্রশাসনিক পরিবেশ আসতে। ঘৃণা ধিক্কার দেয়া ছাড়া আমরা এমূহুর্তে আর কি বা করতে পারি? তবে এই ঘৃণা ধিক্কার যদি সম্মিলিতভাবে সকল ছাত্র-ছাত্রী করতে পারে তাতেও কিছুটা কাজ হতো। কিন্তু সেখানেও রাজনৈতিক আশ্রয় পশ্রয়!

© বদলে যাও বদলে দাও