ভারতের পশ্চিমবঙ্গের করিমপুর। এলাকার একটি হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের পাখাগুলো বিকল। সেগুলো সারানো হবে বলে খুলে ফেলা হলেও, ফেরেনি আর যথাস্থানে। অভিযোগ ? হাজার অভিযোগেও কাজ হয়নি। অগত্যা হাত পাখাই ছিল ভরসা। এক সন্ধ্যায় স্থানীয় ক’জন যুবক, হাসপাতালের সমস্যা মেটাতে, নিজেরাই চাঁদা তুলে, দুটো স্ট্যান্ড পাখা ভাড়া করে এনে,লাগিয়ে দেন প্রসূতি বিভাগে। তারা কোন বিক্ষোভ করেনি। কোন অভিযোগও জানাননি। হাসপাতালের বেশ কিছুঅনিয়ম- অব্যবস্থাপনায় এর আগে তারা বিক্ষোভ দেখিয়েছিল। তাতে সাময়িক অবস্থার পরিবর্তন হলেও, কাজের কাজ কিছু হয়নি। তাই তারা ঠিক করলো সমাধান একটাই। নিজেরা কিছু করতে হবে। তাই নিজেরা চাঁদা তুলে, স্ট্যান্ড পাখাভাড়া করে লাগিয়ে দিয়েছে।
সেই সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে,যতদিন না প্রসূতিবিভাগে পাখার ব্যবস্থা করা হবে,ততদিন তারা এভাবে চাঁদা তুলে,ভাড়া করা পাখা চালাবে। সুখের বিষয় ভাড়ার পাখা বেশিক্ষণ চালাতে হয়নি। পরদিন সকালেই প্রসূতিবিভাগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। জেগে উঠার শুরুটা এভাবেই হয়। অন্যে কি করবে ? সে বিবেচনা পরে। আগে আমি কি করছি ? কতটুকু করতে পেরেছি ? তাই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত। অন্যে কে কি করেছে কিংবা করবে ? তা ভাববার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমি কি করবো ? সর্বাগ্রে সেটাই নির্ধারণ করতে হবে।
উদাহারণ দিয়ে বলি, আমার বাবা ছিলেন, একজন সামান্য রেল কেরানী। তিনি অতি সামান্য দূর্নীতি করতেন। পুরানো রেলের ফেলে রাখা খাতাগুলি লুকিয়ে বাসায় নিয়ে এসে, আমাদের হাতে ধরিয়ে দিতেন। বলতেন, দিস্তা কাগজ/খাতার যা দাম! প্রথমে পেন্সিল দিয়ে লিখবি, তার উপর কলম চালাবি। অপচয় করবি না।
এই সামান্য অপরাধটুকু করতে যেয়ে,ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে বাবা কথা বলতে পারতেন না। লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিতেন। একটি সাদা শার্ট, একটি পায়জামা ও একজোড়া পাম্প স্যু দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। দুদিন পর পর অফিস থেকে ফিরে, সবার অগোচরে গোসলখানায়, শার্ট পায়জামা কাচতে বসলে, পিছনে এসে দাঁড়িয়ে বলতাম, দুটি শার্ট কিনতে পারেন না ? হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে, চিরায়ত মুচকি হেসে বলতেন, আমি যদি দুটি পড়ি, তাহলে তোর তো, একটি পড়তে হবে রে বাপ, বাবা হয়ে তা কি আমি পারি ? পারি না।
সত্তর দশকের শেষের দিকের কথা। উনিশ’ উনাশিতে বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। পেনশনের টাকা তুলতে বাবার হাত ধরে ঢাকার কমলাপুর রেল ষ্টেশনে যেতাম। বাবা সেদিন চোখে মুখে আনন্দ নিয়ে যেতেন। পুরানো বন্ধু কলিগদের সাথে দেখা হবে। দেখা হতো। সাথে আড্ডা আনন্দও হতো। কিন্তু যখন পেনশন বই দিয়ে টাকা তুলতে যেতেন, তখনই মন খারাপ হয়ে যেত। কেন ? কারণ যিনি বই লিখে, বাবার সই নিয়ে টাকা দিতেন, তিনি পাঁচ টাকা উপরি চাইতেন।
প্রতিবারই বাবা আপত্তি করতেন। নানা অজুহাতে দিতে অপারগতা দেখাতেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হতো না। এই টাকার ভাগ হয়তো তর তর করে উপরে উঠতো। তাই কাউকে কিছু বলেও লাভ হতো না। বাবা অনিচ্ছায় পাঁচ টাকা দিয়ে চলে আসতেন। আসার পথে বাবাকে জিজ্ঞেস করতাম, পাঁচ টাকা দিয়ে দিলে কি হয় ? বাবা আমার রেগে যেতেন। বলতেন, বলিস কি ? কেন দিবো ? অন্যায়কে কখনো প্রশ্রয় দিবি না। আর কিছু করতে না পারিস, প্রতিবাদ করবি। তাছাড়া ? আমি উৎসুক হয়ে জানতে চাইতাম, তা ছাড়া কি ? বাবা মুখে কিছুটা লজ্জা নিয়ে বলতেন, তাছাড়া এই পাঁচ টাকা দিয়ে তোকে কিছু কিনে দেয়ার চিন্তা ছিল, তাও হলো না।
বাবা নেই। কমলাপুর স্টেষনের পেনশন অফিসে এখন কি হয় ? জানি না। দেখার খুব ইচ্ছে। হয়তো অন্য কেউ পেনশন দিচ্ছে, পাঁচ টাকার পরিবর্তে ২০/৩০ টাকা নিচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষ পঞ্চাশ টাকা। বাবার মত অনিচ্ছায় সবাই হয়তো দিচ্ছে। নীরবে নিঃশব্দে। আচ্ছা পশ্চিম বঙ্গের করিমপুরের স্থানীয় নতুন প্রজন্মের মত করলে কিরকম হয় ? আমার আশেপাশের নতুন প্রজন্মরা যদি সংগঠিত হয়ে, নিজেরা চাঁদা তুলে, কোন এক মাসের এক থেকে দশ তারিখের মধ্যে, কমলাপুর রেলওয়ে পেনশন অফিসের সামনে যেয়ে দাঁড়ায় ? বলে, আপনারা যে উপরি নিচ্ছেন, তা আমরা দিয়ে দেব….. তখন কি হবে ?
নতুন প্রজন্মদের এ কাজে সংগঠিত করবে কে ? আমি ? আপনি ? না আমরা করবো। আর আমাদের যদি ব্যর্থতা থাকে, তবে তারা নিজেরাই সংগঠিত হবে। কিভাবে ? এই যেমন আমি আমার মেয়েদের তালিম দিচ্ছি, এখন থেকে গড়ে তুলছি। খোলা মেলা বলছি, দেশের জন্য কিছু করতে হবে। প্রস্তুত হয়ে যা মা…. ওরা প্রস্তুত হচ্ছে। আপনিও করেন না, আপনার কাছের নতুন প্রজন্মটিকে প্রস্তুত। আর আপনি যদি এই নতুন প্রজন্মের হয়ে থাকেন, তবে নিজেরাই প্রস্তুত হন। কি প্রস্তুত ? তা হলে সবাই একসাথে সুর মিলিয়ে, হাতে হাত ধরে বলি, জেগে ওঠো বাংলাদেশ………………….






শওকত হোসেন বাদল আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আপনার সুন্দর একটি লেখা’র জন্য। আসলেই আমাদের সকলেরই উচিত প্রথমে নিজে থেকেই সৎ হওয়া। আপনার বাবা কিন্তু সৎ থাকবার জন্যই ঐ চাকরী করেই আপনাকে এতদুরে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন, যেখানে থেকে আপনার মনে অথবা আপনার বিবেকে সৎ আর অসতের পার্থক্যটি আপনি নিজেই করতে পারছেন। উনি সৎ না থাকতে পারলে আপনিও হয়তোবা এই পার্থক্যটা নির্ণয় করতে পারতেন না। আমাদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম এতটাই বাসা বেঁধেছে যে আমাদের এখন ছোট্ট ছোট্ট গ্রুপ করে হলেও প্রতিবাদ করতে হবে। তবে আমার আপনার প্রস্তাবটি খুব দারুন লেগেছে। সবাই মিলে কমলাপুরে যাবার ব্যবস্থা করলে কিন্তু মনে হয় মন্দ হতোনা।
ধন্যবাদ শাআখান। আপনি ঠিকই বলেছেন,আমাদের সবার উচিত নিজে থেকে সৎ হওয়া। সে সাথে সমাজের নানা অনিয়মের প্রতিবাদ করা। আমার
বাবার প্রতি আপনার উপলব্ধি আমাকে মুগ্ধ করেছে। ভাল থাকবেন। শুভেচ্ছা।
শওকত হোসেন বাদল আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার লেখাটি পড়ে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। প্রশ্ন জাগে আমি নিজে কতটুকু করতে পারছি? আজকাল সমাজে এমন এক সংস্কৃতি জায়গা করে নিচ্ছে যা ব্যক্তির নৈতিকতা, মূল্যবোধকে কুড়েঁ কুড়েঁ খাচ্ছে। অর্থাৎ সব অন্যায় সহ্য করে নিয়ে নিজেকে মানিয়ে নেয়া। নিজেকে নিরাপদে সরিয়ে রাখা। যা দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত তা আজ উটকো ঝামেলা মনে করি। কখনো ভাবি না এই ঝামেলা আমারও একদিন হতে পারে। তখন আমার বিপদে কে পাশে দাঁড়াবে? অন্যের বিপদ জানালা দিয়ে উকিঁ দিয়ে দেখে আবার জানালা বন্ধ করে দেয়ার মানসিকতা আমাদের সামাজিক বন্ধন, শক্তি সবই ধ্বংস করে দিচ্ছে।
দু’দশক আগেও আমাদের সমাজ জীবনে পাড়া মহল্লায় নানা ধরনের সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন দেখতে পেতাম। এইসব ক্লাবধর্মী সংগঠনগুলি সামাজিকভাবে অনেক নিরাপত্তা দিতো বা প্রোটেক্ট করতো। কিশোর তরুণরাই ছিল এর মূল প্রাণশক্তি। তারা যেমন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো তেমনি মামাজিক নানা সমস্যা সমাধানে ঝাপিয়ে পড়তো। আপনার লেখায় সেই ফেলে আসা সমাজ জীবনের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। নগর সভ্যতা ব্যক্তির স্বাধীনতার জায়গা যত বৃদ্ধি করছে, যত পাকাপোক্ত করছে বিপরিতে ঠিক ততটাই নিরাপত্তাহীন করে তুলছে সমাজ জীবনকে। আমাদের দেশটি রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিকতায় কখনো মেনে চলতে পারে নি, আমাদের সবটাই সমাজভিত্তিক। এখন এমন একটি অবস্থানে আমরা আছি যে কোনটার মধ্যেই থাকতে পারছি না। আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে তার মাধ্যমে নতুন কিছু গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সে কেবল পারছে বিনাশ করতে। সেটা আপনার, আমার এবং সমাজের সকলের জন্য।
ধন্যবাদ। আপনার উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। সে সাথে অনুপ্রানিত।
বর্তমানেও বেশ কিছু মহল্লায় ক্লাব বা নানা নামে সংগঠন দেখা যায়।যার
অধিকাংশই এখন মাদক জুয়া ও রাজনীতিক ক্যাডারদের পদচারনায় মুখরিত…….আসল কাজ সমাজ সেবা কিংবা সামাজিক উন্নয়ন ? তার
কিছুই হয় না। আপনার অন্যান্য কথাগুলোর সাথেও আমি প্রায় একমত।
আপনাকে শুভেচ্ছা। ভাল থাকবেন।
আপনার লেখা পরে আরেকবার আন্তরিক ধন্যবাদ না দিয়ে পারছি না।চমৎকার আপনার লেখাটি।সবার জানা কিন্তু না বলা সত্য।
আপনার বাবার প্রতি রইল আমার অশেষ সম্মান।তাঁর জন্য শান্তি কামনা করছি।
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি।প্রতিবার যখন বৃত্তির টাকা তুলতে যেতাম, তখন ব্যাংক এর ক্যাশিয়ার ১০ টাকা কম দিয়ে একটা লটারির টিকেট জোর করে ধরিয়ে দিত।প্রথমবার লজ্জায় নিতে হল।কিন্তু পরেরবার বেশ কজন মিলে বললাম যে লটারির টিকেট লাগবেনা, ১০ টাকা এমনি দিলাম।উদ্দেশ্য ছিল কাশিয়ারকে এইভাবেই লজ্জিত করা।কিন্তু লজ্জা বড় দুর্লভ বস্তু আমাদের দেশে।অম্লান বদনে তিনি ১০টাকা সবার কাছ থেকে নিয়ে নিলেন।এর পর কয়েকজন ছেলে জোর মনোবল নিয়ে দাঁড়াল যে কিছুতেই ১০ টাকা দেবেনা।ফলস্বরূপ ১ ঘণ্টা দাড় করিয়ে রাখল শুধু শুধু।দেশ হিসেবে আমরা পিছিয়ে পড়ছি এটা সবাই বলি। কিন্তু মানুষ হিসেবে যে পিছিয়ে পড়ছি সেটা কেউ উপলব্ধি করছিনা।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আমার বাবার প্রতি আপনার অশেষ সন্মান আমাকে মুগ্ধ করেছে। আপনার আমার সবার সমস্যার স্বরূপটা প্রায় ক্ষেত্রেই এক। আমাদের যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে। কারো দিকে না তাকিয়ে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ আমাদেরই নিতে হবে। কারো দিকে তাকিয়ে থাকার দিন বোধ করি শেষ হয়ে গেছে। আবারও শুভেচ্ছা। ভাল থাকবেন।
ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে. প্রটেস্ট করে দেশে ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ কি হয়? better to take own initiative.
ধন্যবাদ আপনাকে।
প্রটেষ্ট করলে দেশে ক্ষতি ছাড়া লাভ হবে না ? বিনয়ের সাথে বলছি, আমি তা মনে করি না। সুন্দর পরিকল্পিত ও ন্যায় সঙ্গত যে কোন প্রতিবাদ দেশের লাভই বয়ে আনবে। আবারও শুভেচ্ছা।