২০০৩ সালের ১৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে (বর্তমানে জহির রায়হান মিলনায়তন) নবীন বরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পথচলা। আমি এ ব্যাচের একজন ছাত্র হিসেবে নিজের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরব।
প্রথম দিনেই মওলানা ভাসানী হলের গেস্ট রুমে গাদাগাদি করে থাকার সুযোগ পাই । প্রথম দিন সন্ধ্যায় নতুন বন্ধুরা মিলে ক্যাম্পাসে বের হব। দেখি হলের গেটে তালা লাগানো। গেটের বাইরে দু’জন বসা। বন্ধুদের একজন ফিসফিসিয়ে বলল ক্ষমতাসীন দলের দুজন ছাত্র নেতা। আমরা বাইরে যেতে চাইলে তারা শাসনের সুরে বললেন, বাইরে যাওয়া যাবেনা। তোরা রাত সাড়ে ন’টায় ৩৪৮ নং রুমে দেখা করবি। ভয়ে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। একে র্যাগিংয়ের ভয়, তার উপর প্রথম দিনেই ছাত্র নেতাদের শাসানী। না জানি কি হয়। হলের বাইরে বের হওয়া হল না। রাত ন’টায় ৪৪৮ এ উপস্থিত হলাম। সেখানে দেখলাম নিভু নিভু আলোতে বসা কয়েকজন নেতা । তারা বললেন হলে সিট পেতে হলে পলিটিক্স করতে হবে। তারা নতুনদের মধ্যে প্রতিনিধি বানিয়ে দিলেন। আরো বলা হল সময় মত মিছিলে না আসলে হলে থাকতে পারবিনা। একটু পরে কানে মিছিলের শব্দ। ভয়ে একটু কেঁপে উঠলাম। ‘পঁচাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, মিছিলের শব্দ গুলো ছিল এরকমই। পরে আমার এক বন্ধু বলল, কাল ১৫ আগস্ট এজন্য এধরনের শ্লোগান। এর পর নতুনরা মিছিলে যোগ দিল। অনেক নতুনরাও সেদিন হাঁটু কাঁপানো ভাষণ দিল…….।
জাহাঙ্গীরনগরে চারটি ভিসির সময়কাল দেখার সুযোগ আমরা পাই। সেই সাথে পাই চারটি সরকারের শাসনকাল। আমরা ক্যাম্পাসে শুরুতে পাই অধ্যাপক জসীমউদ্দিন আহমেদের ভিসিকাল। বর্তমান ভিসি শরীফ এনামুল কবীরের মত তিনি ও অনির্বাচিত, সরকারী দলের পছন্দের ভিসি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলন দেখি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হল এবং বীরকন্যা প্রীতি লতা হলের ছাত্রীদের পানির দাবীতে ঝাঁটা মিছিল। এরপর শিক্ষকদের ক্লাস বর্জন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্রইউনিয়ন এবং ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা সাধারন শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে আন্দোলন বেগবান করে। সাংস্কৃতিক জোটের কর্মীদের পথ নাটক, বিদ্রোহী গান আন্দোলনে নতুন মাত্র আনে। এ সময় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা রুমে রুমে হামলা চালায় সাংস্কৃতিক নেতাকর্মীদের উপর। এক সময় বাধ্য হয় হয় জসীমউদ্দিন সিনেট নির্বাচন দিতে।
অনেক নাটকের পর ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র নেতাদের বিরোধিতা সত্বেও ভিসি হয়ে আসেন খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান। তাকে ক্ষমতায় আনার পেছনে প্রগতিশীল শিক্ষক ও ছাত্র কর্মীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশী ছিল। তাকে ক্ষমতায় আনার পেছনে যাদের ভূমিকা বেশী ছিল তাদের মধ্যে একজন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আলী আকন্দ মামুন। তিনি ভিসি মুস্তাহিদ প্রসাশনে প্রক্টরশীপ পেয়ে ছিলেন। স্থায়ী হয়নি বেশি দিন। ক্ষমতাসীন ছাত্রনেতাদের কটুক্তি আর নিজের কিছু ব্যর্থতায় তাকে পাড়ি জমাতে হল বিদেশে। মুস্তাহিদের আশেপাশে জায়গা করে নিল চামচা চামুন্ডারা। যে সব শিক্ষকরা নিজেদেরকে ছাত্রদলের ক্যাডার বলে পরিচয় দিত। এদের মধ্যে মাফরুহী সাত্তার, বদিউর রহমানরা ছিলেন। মাফরুহী সাত্তার ছাত্রদলের মিছিলে সামনে থাকতেন। ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল ছাত্র নির্যাতন আর সাংবাদিক নির্যাতনের পরিকল্পনা তার বাসায় বসে হত।এদের কেউ প্রক্টর থাকাকালীন এসকল শিক্ষক বলত আমি রাস্তায় আছি, যা অমুককে মেরে আয়। মুস্তাহিদুর রহমানের সময় তার বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রগতিশীল ছাত্রছাত্রী আর সাধারন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয় যৌন নিপিড়নকারী শিক্ষক তানভীর আহমেদ সিদ্দীকি ও গোলাম মোস্তফা। মুস্তাহিদের সময় ক্যাম্পাসের সাংবাদিকদের উপর নেমে আসে প্রসাশনের খড়গহস্ত। জনকন্ঠের রিপোর্টার আলমগীর স্বপনকে মারধরের মাধ্যমে তারা সাংবাদিক নিপীড়ন শুরু করে। এখনও চোখে ভেসে বেড়ায় মুস্তাহিদকে নিয়ে করা জনকন্ঠের সম্পাদকীয় ‘যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ’।
প্রথম আলোর রিপোর্টার নূর সিদ্দিকীর রুমে গভীর রাতে কে বা কারা আগুন লাগিয়ে দেয়। জনকন্ঠের কুন্তল রায়কে মিছিলে না যাওয়ার খোড়া অজুহাতে রুমে ঢুকে ক্ষমতাসীন ক্যাডাররা নির্যাতন করে। ভর্তি ফরমের মূল্য বৃদ্ধি, ডাইনিং এ খাবারের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ করলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ক্ষমতাসীন ছাত্র ক্যাডারদের প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও সাংস্কৃতিক জোটের কর্মী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন। ছাত্র জোটের নেতা সৌমিত্র কুমার, নাসিরউদ্দিন প্রিন্সকে বটতলায় পিটিয়ে ফেলে রেখে যায়। এক সময় দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদায় নিতে হয় অধ্যাপক মুস্তাহিদুর রহমানকে।২০০৯ সালে মহাজোটের মহাবিজয়ের পর ক্ষমতা পান বর্তমান ভিসি শরীফ এনামুল কবীর। তার সময়ের সবচেয়ে প্রথম বড় অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে আলবেরুনী হলে মারা মারির ঘটনা। তার উপস্থিতিতেই ক্ষমতাসীন দলের নেতারা পিস্তল, রামদা, হকিস্টিক নিয়ে গেট ভেঙ্গে প্রবেশ করে আল বেরুনী হলে। তারা প্রতিপক্ষ গ্রুপ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে হলের তিনতলা ও চারতলা থেকে পাখির মত নিচে ছুড়ে ফেলে দেয়। হায়রে বর্বরতা! এ মারা মারির সময় ভিসি ঘটনা স্থল ত্যাগ করা কালে সাংস্কৃতিক জোটের কর্মী মাহি মাহফুজ বলেন, ‘স্যার আপনি অবিভাবক হয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে পারেন না’।
এ কথার কারণে তাকে শোকজ লেটার দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে মাহিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের বিষয়ও আলোচনায় আসে।বর্তমান ভিসির কোন একটা ভাষণ শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তিনি বক্তব্যের এক পর্যায়েই বলেন, ‘কেউ মাস্তানী করার চেষ্টা করবা না, আমি এই ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগের সভাপতি, আমিই এই ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগের সেক্রেটারি’।
এ জন্য তার সমর্থিত ছাত্রলীগের গ্রুপটি ভিসি পন্থী ছাত্রলীগ নামে পরিচিত। বর্তমান প্রশাসন সবচেয়ে বেকায়দায় পড়ে ইংরেজী বিভাগের ছাত্র যোবায়ের নিহত হওয়ার পর। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের উদাসীনতায় জীবন যায় মেধাবী এ শিক্ষার্থীর। এ হত্যার বিচারের দাবীতে মাঠে নামে প্রগতিশীল শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ শিক্ষাথীরা। তাদের দাবীটি ভিসি পতনের আন্দোলনে আসলে গত ২৮ তারিখে যে বর্বরোচিত ঘটনা ক্যাম্পাসে ঘটেছে তা বর্তমান ভিসির বিদায় ঘন্টার ঘোষণা দিচ্ছে।






ধন্যবাদ, আহমেদ ইউছুফ আপনি ঠিকই বলেছেন কবে যে এ সংস্কৃতি চালু হবে ছাত্রদের রাজনীতি ছাত্রদের জন্যই হবে দেশের সংকটকালে ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ এর মত সবাই একসাথে প্রতিবাদ করবে সে দিনের প্রতীক্ষায় চেয়ে রইলাম
আমি সহজ সরল ও সাধারন মানুষ। অত কিছু বুঝি না। সহজ কথায় বলতে চাই। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও দলবাজি দুর করার জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন থাকবে না। বড়জোড় ছাত্র ইউনিয়ন/প্রতিনিধি থাকতে পারে। যাতে তারা ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান নিয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করতে পারে। শিক্ষাঙ্গনে পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকলে তা আমাদের জাতীয় জীবনে মারাতœক প্রভাব বিস্তার করে। কেননা আজকের ছাত্ররাই একসময় কর্মক্ষেত্রে বিচরন করবে। সুতরাং তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু পাওয়ার জন্য ছাত্রদেরকে নোংরা দলবাজি ও ধ্বংসাতœক রাজনীতির বাইরে রাখাই উচিত বলে আমি মনে করি। ধন্যবাদ গাজী ইমরান হাসান।
আহমেদ ইউসুফ
ঢাকা, ০১ মে ২০১২ ইং।
এখন বিশ্ববিদ্যালয় গুলু সরকারের আজ্ঞাবহে পরিনত হয়েছে _ এখানে যে যত বেশি চাটুকারগিরি করতে পারে তার দাম বেশি ।