Home » অন্যান্য » শুধু দশ

শুধু দশ

197 বার পঠিত

বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে শুভ্র রাস্তায় এসে দাঁড়াল। ঘাড় ঝুঁকিয়ে ডানে বামে বার দুয়েক তাকালো যদি কোন রিক্সার দেখা পায়। কিন্তু আজ রাস্তায় কোন রিক্সাই নেই। অনেক রাত হয়ে গেছে এ জন্য আজকে মনে হয় ভোগান্তিতে পড়তে হবে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর শুভ্র হেঁটে হেঁটে খানিকটা দূরে একটা ছোট্ট দোকানে বসে থাকা এক অল্পবয়সী ছেলেকে গিয়ে বলল, “ এবিসি ব্র্যান্ডের একটা সিগারেট দাও তো।”

ছেলেটি বলল, “অ্যাত দামী সিগারেট রাখি না। আমার কাছে ক্রাঊনলিফ সিগারেট আছে, দিমু?”
শুভ্র বলে, “কি মিয়া, ভালো জিনিস রাখতে পারো না?”

রিক্সা না পাওয়ার বিরক্তিটা খানিকটা দোকানের ছেলেটার উপর ঝেড়ে ফেলে শুভ্র। পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে বলে, “দাও তোমার ক্রাউনলিফ না ট্রাউনলিফ কি আছে।”
এমন সময় মনে হলো একটা রিক্সা বড় রাস্তা থেকে গলির  দিকে ঢুকলো। টের পেয়ে হাতে সিগারেটটা নিয়েই শুভ্র জোরে ডাক দিলো, “ এই রিক্সা…যাবে নাকি?”

কোন উত্তর না দিয়ে রিক্সাটা ঘুরিয়ে সোজা শুভ্রর কাছাকাছি চলে এল। রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়ালো মাঝারি বয়সের রিক্সাচালকটি। ঘাড়ে রাখা গামছাটা হাতে নিয়ে কপালে বিন্দু বিন্দু জমা ঘাম মুছে নিয়ে রিক্সাওয়ালা বললো, “কই যাইবেন?”

শুভ্র বলে, “বড় মসজিদ যাবো। যাবেন?”

“যামু।”

“কত নিবেন?”

“৩৫ টাকা।”

২৫ টাকা ভাড়ার জায়গায় ৩৫ টাকা চাওয়ায় মেজাজ খারাপ হয়ে গেল শুভ্র’র।

 

“কী! ৩৫টাকা? মাথা ঠিক আছে?”

রিক্সাওয়ালা নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।

তার এইভাব দেখে মেজাজ চড়ে গেল শুভ্র’র।

সে বলতে থাকল, “এইখান থেকে বড় মসজিদ ৩৫ টাকা রিক্সা ভাড়া নাকি মিয়া? সব শালারা ঠকবাজ হয়ে গেছে। মানুষ ঠকানো টাকা দিয়া কি গাঞ্জা খাইবা?”

হাতে রাখা গামছাটা আবার ঘাড়ে রেখে রিক্সাওয়ালা খুবই নরম স্বরে বলে, “বাবারে, গত দুইদিন হরতালে রিক্সাখান বাইর করতে পারি নাই। ঘরে ছোড মাইয়াটার অসুক করচে। অরে দুইদিন অষুদ খাওয়াইতে পারি নাই। এই ট্যাকাখান দিয়া অষুদ কিনে খাওয়াইমু রে বাপ।”

অন্ধকারে চোখ দেখতে না পেলেও ধরে আসা গলাটা শুনে বেশ বুঝতে পারে শুভ্র, চোখটা জলে ভরে গেছে রিক্সাওয়ালার।

মাথাটা মাটির দিক করে কী যেন ভাবে শুভ্র। হঠাৎ করেই নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয় তার। তারপর মাথাটা তুলে রিক্সাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলে, “চলেন।”

শুভ্রকে উঠিয়ে নিয়েই রিক্সাটা বড় রাস্তার দিকে ঘুরিয়ে নেয় রিক্সাওয়ালা।

জোরে জোরে প্যাডেল করতে থাকে। অনেক রাতের ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগে শুভ্র’র। গভীর রাতের এমন ঠান্ডা হাওয়া তার অনেক পছন্দের। কিন্তু আজ একটুও ভালো লাগছে না ওর।

দুপাশের হলুদ আলোয় পরিবর্তিত রঙের রাস্তাটা দেখতে দেখতে ভাবতে থাকে রিক্সাওয়ালাটার কথা। রিক্সাওয়ালা ১০ টাকা বেশি নেওয়ার ব্যাপারটা।
সে ভাবে,  এটা কি অন্যায়?
শুভ্র বেশ ভালো করে জানে, এই টাকাটা বস্তাভর্তি করে কাউকে উপহার দেওয়ার জন্য নয়, এই টাকাটার বান্ডিল তৈরী করে বালিশের তলায়, তোশকের তলায় লুকিয়ে রাখার জন্যও নয়। সে এও জানে, টাকাটা দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের ঘরের এসি হয়ে ঝুলবে না কখনো, টাকাটা বহুতল বিশিষ্ট বিপণনকারীদের (MLM!) পেছনে গাড়ি হয়ে ঘুরবে না কখনো। এক অসহায় বাবার লাঞ্ছনার বিনিময়ে পাওয়া টাকাটা বাঁচাবে তার সন্তানকে। আবার হাসাবে তার সন্তানকে। সন্তানের জীবন বাঁচানোর এই টাকা নেওয়াটা যদি অন্যায়ের হয় তাহলে মন্ত্রী, এমপি দের …
হঠাৎ ঝাঁকুনিতে শুভ্র’র চিন্তা বাধাগ্রস্ত হয়।

“বড় মসজিদ আইসা গেছি।”

রিক্সাওয়ালার কথায় সম্বিত ফিরে পায় শুভ্র।

“ও…এসে গেছি না?”
এই বলে রিক্সা থেকে নেমে যায় সে। পকেট থেকে টাকাটা বের করে রিক্সাওয়ালাকে দিয়ে বলে, “মেয়ের যত্ন নেবেন।”

যেন অনুগ্রহের টাকা পেয়েছে এমন একটা ভাব করে কপালে টাকাটা ছুঁইয়ে রিক্সাটাকে ঘুরিয়ে নিলো রিক্সাওয়ালা। চোখের আড়াল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত রিক্সাটার দিকে তাকিয়ে থাকলো শুভ্র।

বাড়ির দিকে হাঁটা দেবার ঠিক আগে চোখ পড়লো হাতে রাখা সিগারেটটার দিকে। সে স্পষ্ট দেখলো, সিগারেটটা তার দিকে প্রচণ্ড অবজ্ঞা ভরে তাকিয়ে আছে। প্রতিদিন দুই ঠোঁটের ফাঁকে ৮ থেকে ১০টা ধোঁয়ায় উড়িয়ে দেয় যাদের, সেই দশ টাকা দামের একটা সাদা দেহের সিগারেটের তাচ্ছিল্য বড় অসহ্য লাগে শুভ্র’র।

তবু সে বাড়ির পথে পা চালালো। তবে, তার আগে হাতে রাখা সিগারেটটা দুমড়ে মুচড়ে ছুঁড়ে ফেললো দূরে,বহুদূরে,চিরকালের জন্য।

মন্তব্য
  • Al Masud মে 7, 2012 at 4:49 অপরাহ্ন

    স্বামী-স্ত্রী যাচ্ছে মার্কেটে। ৮/১০ বছরের একটি শিশু বলল- ম্যাডাম, কিছু দ্যান…। স্ত্রী ১০ টাকা বের করে দিতেই স্বামী বলল- তুমি কাকে টাকা দিচ্ছো? এরা ভনিতা করে; অভিনয় করে। এদের দেখলে মনে হয় এরা অনেক অসুস্থ্য কিন্তু এদের কোন সমস্যা নেই।
    স্ত্রী: আমি মানলাম এরা সুস্থ‌্য আছে কিন্তু সেই সাথে এরা অনেক ক্ষুধার্থ আছে; এরা অপুষ্টিতে ভোগে; এদের চেহারা দেখলে সেটা বোঝা যায়। আমি ধরে নিলাম এরা অভিনয় করে কিন্তু কি কারনে অভিনয় করে? বলিউডের শাহরুখ খান ও অভিনয় করে। সে অভিনয় করে টাকার জন্য আর এরা অভিনয় করে পেটের জন্য। দু’মুটো ভাতের জন‌্য। আমাদের মতো ভদ্র সমাজ এসব শিশুদের মৌলিক অধিকারটুকু দিতে পারিনি। আমরা এসব পথশিশুদের কাছে অনেক ঋণী।
    ধন্যবাদ- অরূপ কুমার

© বদলে যাও বদলে দাও