।। ইমাম হোসাইন সোহেল।।
এই লেখাটা ‘বদলে দাও বদলে যাও’ মিছিলে যখন প্রকাশ হবে, তখন ‘মা দিবস’ পার হয়ে যাবে। হয়তো বা একদিন-দু’দিন দেরিও হয়ে যেতে পারে। তাতে কী! তবুও আমি লিখলাম। আমার ‘মা’কে নিয়ে লিখতে কোন দিবস লাগে নাকি?
করপোরেট দুনিয়া হয়তো মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে ‘বিশ্ব মা দিবস’ হিসেবে পালন করার রীতি বের করে নিয়েছে। যাদের কাছে মায়ের মুল্য মাত্র একদিনের জন্য, তারা তো বছরে একটি দিনকেই বেছে নেবে (এর পেছনে অধিকাংশই যে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না)। কিন্তু আমার কাছে কোন দিবস-টিবস নেই। বছরের ৩৬৫ দিনই তো আমার মায়ের জন্য। ‘মায়ের জন্য ভালোবাসা’ আমার সপ্তাহের সাতদিন প্রতিদিনই এবং দিনের ২৪ ঘন্টাই। যারা পুরো বছর মায়ের কোন খোঁজ খবর রাখে না, বিশ্ব মা দিবস শুধু তাদের জন্য। ওই একটি দিন মায়ের জন্য তারা আহ্লাদে মেতে ওঠেন। করপোরেট দুনিয়া কত সুন্দারভাবেই না মা থেকে আমাদেরকে দুরে রাখে।
আমার মমতাময়ী ‘মা’। আপনাকে সম্মান-শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কিন্তু এ লেখা নয়। কলমের কালি দিয়ে আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধাকে কী পরিমাপ করা সম্ভব? কোন ভাবেই না। আমার পৃথিবীজুড়ে শুধুই একজন। সে তো আপনিই। দু’কলম লিখে আপনার প্রতি আমার ‘ভালোবাসা’কে খাটো করতে পারি না। আপনার পদতলে যে আমার বেহেস্ত! তাহলে ছোট্ট এই পরিসরে আমার শ্রদ্ধা, ভালবাসার কথা লিখে কিভাবে আপনাকে অসম্মান করি! সে সাহস আমার কোথায় বলুন!
‘মা’ আজ আপনি আমার চেয়ে কত দুরে…! পথের মাপে সেটা হতে পারে আড়াইশ’ কিংবা তিনশ’ কিলোমিটার। কিন্তু মায়ের সঙ্গে সন্তানের হৃদয়ের দূরত্ব কি কখনও এত যোজন যোজন হতে পারে? সেখানে তো এক সুতা পরিমানও ব্যবধান নেই। অনেকে হয়তো তার মা থেকে হাজার কিলোমিটারও দুরে অবস্থান করেন। কিন্তু কেউ কি কখনও বলতে পারবেন, মায়ের সঙ্গে আমার দুরত্ব এত এত? সন্তানের সঙ্গে যে মায়ের নাড়ির সম্পর্ক! কোন বাপের ছেলের সাধ্যি আছে যে মাকে অস্বীকার করতে পারে?
‘মা’ সন্তানদের কাছে আপনি কত আপন, কত কাছের তা কি কখনও ভেবে দেখেছেন? এই যা, এখানেই তো একটা ভুল করে ফেললাম। এটা তো মা’রাই সবচেয়ে বেশি জানেন। ভেবে দেখার কি আছে? সন্তান মাকে যত কষ্টই দিক না কেন, মা যখন সন্তানের মুখের দিকে তাকান তখন সব কষ্ট ভুলে যান। আপন স্নেহে, আপন মমতায় তারা সন্তানকে কাছে টেনে নেন। পরম স্নেহে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন সন্তানের সকল দুঃখ-বেদনা। ‘মা’ বলেই এটা সম্ভব। মা’রাই কেবল পারেন এতটা উদার হতে, এতটা স্নেহময়ী, মমতাময়ী হতে।
মা’ আপনি জানেন কি না জানি না। মানুষের ব্যথা পরিমাপ করার জন্য বিজ্ঞান যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। আধুনিক বিজ্ঞানই বলে, মানুষ সর্বোচ্চ ৪৫ ডেল (ব্যাথা পরিমাপের একক) ব্যাথা সহ্য করতে পারে। কিন্তু একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন তখন তিনি ৫৭ ডেল ব্যাথা সহ্য করেন। যা একই সময়ে ২০টি হাঁড় ভেঙ্গে দেওয়ার সমান। সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতে কতটুকু কষ্ট আপনাকে করতে হয় তা আমরা সন্তানরা বুঝব কি করে! বিজ্ঞান হয়তো এটা উপলব্ধি করতে সহায়তা করেছে। কিন্তু আপনাকে তো শুধু এ কষ্ট স্বীকার করেই বসে থাকতে হয় না। একটি সন্তানকে লালন-পালন করে বড়ে করে তুলতে আপনার যে ত্যাগ, যে তিতিক্ষা তার ঋণ আমরা শোধ করবো কি করে? আমাদের কলিজাটা কেটে টুকরো টুকরো করে আপনার পদতলে রেখে দিলেও তো কখনও তা শোধ হবার নয়। সেই কষ্ট তো ৫৭ ডেলের চেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি।
‘মা’, প্রাণী জগতের অন্য যে সব প্রাণী আছে, তাদের সন্তানরা পৃথিবীতে আসার পর হাঁটতে জানে, দৌঁড়াতে জানে, উড়তে জানে কিংবা সাঁতার কাটতে জানে। কিন্তু একমাত্র মানুষ! শুধু মানুষই ব্যাতিক্রম। তারা না পারে হাঁটতে-দৌঁড়াতে, না পারে উড়তে আর না পারে সাঁতার কাটতে। ক্ষুধায় ছটপট করলেও মানব সন্তান কখনওই পারে না নিজের খাবারটা চেয়ে খেতে। কিন্তু ‘মা’ আপনার হৃদয় কিভাবে যেন তা জেনে যায়। ছুটে এসে আপনি সন্তানের ক্ষুধা নিবারণ করেন। প্রচণ্ড শীতের রাতে যখন আপনার সন্তান বিছানায় প্রশ্রাব করে দেয়, তখন আপনি রেগে যান না, ছুড়েও ফেলে দেন না। পরম মমতায় সন্তানের ভেজা কাপড়, ভেজা বিছানা পাল্টে দিয়ে তাকে স্নেহের কোলে তুলে নেন। আড়াই বছর বুকের দুধ পান করান, লালন-পালন করে বড় করে তোলেন। ভালোকে ভালো, খারাপকে খারাপ জানতে শেখান। আপনি কখনও আমাকে মিথ্যা বলতে শেখাননি, চুরি করতে শেখাননি। বলেননি অমুকের গাছের ওই আমটি পেড়ে এনে আমাকে খাওয়াও, অমুকের ওই জিনিসটি নষ্ট করে দিয়ে এসো। আপনি আমাকে শেখাননি কিভাবে দুর্নীতি করতে হয়। কোন মা’ই চায় না তার সন্তান খারাপ হোক। খারাপ পথে চলুক, খারাপ কামাই করুক।
মা আমি আপনার সেই সন্তান। দেখুন আপনার ছেলে কত বড় হয়েছে। কিন্তু ‘মা’ আমি আপনার কাছে যে চিরকালই ‘ছোট্ট খোকা’! সেই ছোট্টটিই থেকে যাবো। জীবনে যত বড় হই না কেন, কোনদিন যদি কোন ভুল করি, তাহলে যেন সেই ছোটবেলার মত আমার ভুল ধরিয়ে দেন। শাসন করে যেন আপন স্নেহে আবার কোলে টেনে নেন। মা কোন বিশেষ দিবসে নয়, আমি আপনার কাছে এই মমতা চাই বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ।
আমার মা’ই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ‘মা’। সব সন্তানের কাছেই এটা অমোঘ একটি সত্য কথা। প্রিয় পাঠক, আপনার মা যেন আপনার কাছে সত্যিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, সবচেয়ে আপন হতে পারেন সেটাই কামনা করি। আল্লাহই তো বলেছেন, আল্লাহ এবং মুহাম্মদ (সঃ) এর পর যেন মানুষের কাছে সবচেয়ে গ্রহনীয়, সবচেয়ে শ্রদ্ধার ব্যাক্তি হন তার মা-বাবা। রাসুল (সঃ) নিজেই বলেছেন, ‘সম্মান করবে তোমার মাকে, এরপর তোমার মাকে, এরপর তোমার মাকে, এরপর তোমার বাবাকে।’ অর্থাৎ বাবার চাইতেও মায়ের মর্যাদা তিনগুন বেশি।
এমন ‘মা’কেও যারা কষ্ট দেন তারা সত্যিই মানুষ কি না আমার প্রশ্ন জাগে। স্ত্রীর প্ররোচনায় হোক কিংবা অন্য যে কোন কারণেই হোক, মাকে অনেকেই কষ্ট দিয়ে থাকেন। হাল আমলে ঝামেলা মনে করে অনেকে বাবা-মাকে রেখে আসেন বৃদ্ধাশ্রমে। কিন্তু যারা এ কাজ করেন কখনও কী ভেবে দেখেছেন তারাও একদিন বৃদ্ধ হবেন, তারাও মা-বাবা হবেন? তাদের নিয়তিতেও যে এমন কিছু লেখা নেই, তার নিশ্চয়তা কি? মা তো মা’ই। সন্তানের এমন আচরণও তারা কিভাবে যেন পরম মমতায় ক্ষমা করে দিতে পারেন! ভাবতে পারি না আল্লাহ তাদের হৃদয়ে কী এমন স্নেহের সমুদ্র সৃষ্টি করে দিয়েছেন!
যাদের ‘মা’ আজ বেঁচে নেই, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে অমুল্য সম্পদটিই হারিয়েছেন। জন্মান্তরের বাঁধণ ছিড়ে ‘মা’ আজ শ্রষ্টার সান্নিধ্যে। পৃথিবীর সবাই আপনার কাছে ভালবাসার প্রতিদান চাইতে পারে, এমনকি আপনার স্ত্রীও। কিন্তু একমাত্র মা! মা’রাই পারেন কোন প্রতিদানের আশা না করে আপনাকে ভালবাসতে। মা’য়ের অভাব আপনিই হয়তো বুঝতে পারবেন অনেক বেশি (ব্যস্ত এ পৃথিবীতে অনেকের অবশ্য সে বোধ এখন আর নেই)।
মা আমরা আপনার সন্তান। অনেক ভুল, অনেক অপরাধ জেনে হোক বা না জেনে হোক, হয়তো করে ফেলেছি। মা আমরা জানি আপনি দয়ার সাগর। সন্তান যখন আপনার সামনে অপরাধ স্বীকার করে দাঁড়ায় তখন কোন ‘মা’র হৃদয় নরম হয় না বলুন! আপন মহিমায় আপনি আমাদের ক্ষমা করবেন এটাই প্রত্যাশা। ‘মা’ দিবস বলেই নয় শুধু, বছরের প্রতিটি দিনই এ প্রার্থনা আপনার কাছে আমাদের। আর শ্রষ্টার কাছে প্রার্থনা, ‘হে আল্লাহ ছোট্টবেলায় মা-বাবা আমাদের যেভাবে লালন-পালন করেছেন তুমিও ঠিক সেভাবে তাদের লালন-পালন করো। আমিন…।’
লেখক: সাংবাদিক
support.sohel.ocp@gmail.com






আহমেদ ইউসুফ, সুন্দর মন্তব্যের জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আসলে কোন মা’ই তার সন্তানের অমঙ্গল কামনা করতে পারে না। শিশু সামিউল মায়ের সহযোগিতায় নিহত হয়েছে, এটা সত্য। সমাজের বিরল এবং বিিচ্ছন্ন একটি ঘটনা এটা। আমার মনে হয় না, শিশু সামিউলের মা কোন ‘মা’য়ের পর্যায়ে পড়। পড়লে তিনি নিিশ্চত এমন কাজ করতে পারতেন না। ‘মা’ রূপে নারী জাতির কলঙ্ক তিনি।
জনাব, ইউসুফ, আপনার েপাস্টটিতে সম্ভবত ফন্ট সমস্যা আছে। দয়া করে, আপনি একটু দেখে নেবেন।
“একজন সন্তান হিসাবে মায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো দুঃসাহস আমাদের কারো নেই। গর্ভধারন করেন বলেই তিনি গর্ভধারীনি আবার জম্ন দেন বলেই তিনি জননী। এসবই মায়ের ভূমিকার এক একটি খন্ডচিত্র মাত্র। আসলে মাকে কখনোই সম্পূর্ন রুপে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। কেননা সন্তানের জীবননাট্যে মা যে অপরিহার্য ও প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন তা সর্বজন ও সর্বসমাজে বিদিত। ছোট্ট একটি শব্দ ”মা” ডাকটি যে কতো মধুর তা সন্তান মাত্রই বুঝতে পারেন। অনেকে হয়তো মা জীবিত থাকতে তার স্বরুপ উপলদ্ধি করতে পারেন না। মাকে নিয়ে কবিতা গল্প উপন্যাস এ পর্যন্ত কম লেখা হয়নি। মায়ের বন্দনা, স্তুতি সংগীতেও মুর্ছনা ছড়িয়েছে। জেমস এর “মা” গানটির কথা উল্লেখযোগ্য। ম্যাক্সিম গোর্কির “মা” আর আনিসুল হকের “মা” এর মধ্যে আমি কোন পার্থক্য খুজে পাইনি। কেননা মা সার্বজনীন। ইংরেজ, আমেরিকান আর বাঙ্গালীর “মা”এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। মায়ের আদর ভালোবাসা সেই সৃষ্টির আদিকাল থেকে যেমন ছিল আজও তেমনি আছে। মাকে নিয়ে এর আগে কখনো লেখা হয়নি। তাই মাকে এতটা উপলব্ধিও করিনি কখনো।
আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ মা। সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা সেই চিরন্তন ও সার্বজনীন। যদিও কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা মায়ের মর্যাদাকে ধুলি ধুসরিত করছে। যেমন শিশু সামিউলকে মায়ের সহযোগিতায় হত্যা, একটি অন্যতম ও ব্যতিক্রমী ঘটনা। তবুও আমরা মাকে অনেক শ্রদ্ধা জানাই। পরিশেষে জগতের সকল মায়ের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ূ কামনা করে শেষ করছি। “ধন্যবাদ সোহেল মাকে নিয়ে আপনার সময়োপযোগী ও নিরীক্ষাধর্মী লেখার জন্য”
আহমেদ ইউসুফ
ঢাকা, ১৪ মে ২০১২ ইং