Home » ফিচার2 » রাসায়নিক ও ভেজালমুক্ত খাদ্য কেন পাব না

রাসায়নিক ও ভেজালমুক্ত খাদ্য কেন পাব না

234 বার পঠিত

বাংলাদেশের মানুষের অপুষ্টিজনিত সমস্যা, স্বাস্থ্যগত অবনতির কথা বিশ্ববাসী জানেন। আমাদের কর্মক্ষমতা, গড় আয়ু ও উচ্চতা বাধাগ্রস্ত। চীন ও জাপানের মানুষেরা বাঙালিদের তুলনায় একটু খর্বাকৃতিই ছিল। কিন্তু তারা গত শতাব্দীতেই দৈনন্দিন খাদ্যের পুষ্টিমান গবেষণা করে তাদের গড় আয়ু ও উচ্চতা আশাতীত বৃদ্ধি করছে। অপরদিকে আমাদের দেশের মানুষ ক্রমে বেঁটে হয়ে যাচ্ছে, গত ৩০ বছরে আমাদের গড় উচ্চতা এক-দেড় ইঞ্চি কমে গেছে। আমাদের জীবনীশক্তি কমে যাচ্ছে। শিল্পী এস এম সুলতানের তুলিতে আঁকা সেই কর্মঠ বীর বাঙালির পেশিবহুল সুঠাম গড়নের মানুষগুলো এখন কেবলই বিস্মৃতি।

দেশের মানুষ খাবারের পুষ্টিমানের অভাব পূরণের চেয়ে অধিক বিপদে পড়েছে চলমান খাদ্যচক্রের বিষাক্ত রাসায়নিক ত্রাস ও ভেজাল নিয়ে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের ‘বিষাক্ত খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি’ শীর্ষক সেমিনার তথ্য থেকে জানা যায়, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতিবছর প্রায় ‘তিন লাখ লোক ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৫০ হাজার, কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ। এ ছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।’ অর্থনৈতিক ক্ষয়তির কথা না-ই বা বললাম।

আমরা এখন কোনটাকে সামলাব? পুষ্টিমান উন্নয়ন না ভেজাল প্রতিরোধ বেশি জরুরি? এই প্রশ্ন কেবল সরকারের কাছেই করা যায়। কেননা এসব দেখভাল করার ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো, গরিব মানুষের ট্যাক্স দেওয়া বেতনভুক্ত শত শত জনবল সম্পূর্ণরূপে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু আমরা দেখছি, সরকারের প্রতিনিধিরা ফুটবল মাঠের মতো ‘বল’টি বিভিন্নজনের কাছে পাস করে দিচ্ছেন। মূলত অতিপ্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ছলাকলা। যেমন, সরাসরি সম্পৃক্ত বললে স্থানীয় সরকার, শিল্প, বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এর সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া এই মন্ত্রণায়লগুলোর অধীনে রয়েছে কয়েকটি বিভাগ ও অধিদপ্তর। এসবের মধ্যে বিএসটিআই ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে কাজ করছে খাদ্য আদালত, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে চলছে মোবাইল কোর্ট।

এসব উদ্যোগ দেখে দেশের মানুষের নিরাপদ খাদ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে ঠিক ততটাই উল্টো চিত্র। আজ যদি আমার বা আপনার পরিবারের কোনো সদস্য ভেজাল খাদ্য খেয়ে বা খাদ্যে রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় মারা যায়, তবে আপনি কার কাছে বিচার চাইবেন? কার বিরুদ্ধে মামলা করবেন? এর উত্তর ইহজনমে নাগরিকদের পাওয়া সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারি আইনিব্যবস্থায় এটা প্রমাণ করাই সম্ভব নয় কার দোষে আপনি মরেছেন।
ধরুন, দিনাজপুরের ১৪টি শিশুর কীটনাশক বিষ মিশ্রিত লিচু খেয়ে মৃত্যুর তিপূরণ নিয়ে আপনি আইনি লড়াই করবেন। প্রথমেই আসবে কৃষি মন্ত্রণালয়। কারণ, পেস্টিসাইডের বিষয়টি তাদের অধীনে। তাদের আসামি করলে তারা বলবে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এগুলোর আমদানির অনুমতি দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ধরলে তারা বলবে, কীটনাশক ওষুধ তো পোকামাকড় মারার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে, দেশের মানুষ অসচেতন, তারা এসব খাচ্ছে কেন? মানুষ মরছে কেন এটা ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। তারা বলবে ওষুধ তো ঠিকই আছে, এটা মানুষের জন্য নয়। বলবে, এই লিচুর মধ্যে মানুষের প্রাণহানিকর কিছু আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ধীন জনস্বাস্থ্য পরীক্ষাগারের ফুড অ্যানালিস্টের কাছ থেকে নিতে হবে। অ্যানালিস্ট বলবেন, আমাদের অমুক মেশিনটি নেই, যার জন্য একটি অংশের ফলাফল বের করা সম্ভব নয়। স্যাম্পল যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে হবে। এটা পাঠাতে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে।

প্রিয় পাঠক, লিচুর মতো অন্য যেকোনো ভেজাল খাদ্যপণ্য নিয়ে আপনি মাঠে নামলে আপনাকে আরও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়তে হবে। প্রায় ১৮টি প্রতিষ্ঠান এই নিরাপত্তা জালে যুক্ত। কলিজা শুকিয়ে যাবে, যখন শুনবেন খাদ্য ভেজাল হাতেনাতে ধরেও ভোক্তাদের এ দেশে মামলা করারই অধিকার নেই! ভোক্তা অধিকার সংরণ আইন ২০০৯ আইনে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তা নিজে মামলা করতে পারবেন না, করবেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। কিন্তু এই বিধির মাধ্যমে মহাপরিচালকেরও হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ভোক্তা অধিকার আইনের বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করে নাগরিক সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, অস্পষ্ট বিধির আড়ালে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী-উৎপাদনকারীর স্বার্থ সংরণ করা হয়েছে এই আইনে। যে কারণে আমরা বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর মতো একটি বিশেষায়িত ‘ওষুধ ও খাদ্য প্রশাসন’ তৈরি করতে পারছি না। এ জন্য মরে গেলে প্রমাণ প্রাপ্তি ও বিচার পাওয়ার অধিকার নেই।

আমরা আজ নিজ দেশে নিজ আইনে পরাধীন। এই সাধারণ সমস্যার সমাধান নির্বাচিত সরকারগুলোর কাছ থেকে আদায় করতে পারছি না। তারা ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদেরই পক্ষে। কেননা দেশের নেতারা কোনো না কোনোভাবে নিজেই ব্যবসায়ী! দেশের ১৬ কোটি মানুষ আজ অসহায় হয়ে পড়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আর কিছু ব্যবসায়ীর কাছে। আমাদের চারপাশ ঘিরে ফেলেছে তাঁদের দুর্নীতি। পুঁজির কাছে সবকিছু অবনত হয়ে পড়েছে। এই অর্গল বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছিন্নভিন্ন করার কোনো বিকল্প নেই।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বদলে যাও বদলে দাও মিছিলের উদ্যোগে দেশের জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সংকটগুলোকে ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করে এক নাগরিক জাগরণের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে নিয়ে দেশ টেলিভিশন চ্যানেলেও প্রচারিত হচ্ছে এসব ইস্যুভিত্তিক বিশেষ সংলাপ অনুষ্ঠান। নাগরিকদের মত প্রকাশের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছেwww.bodlejao bodledao.com ব্লগ। এখানে প্রতিদিন নাগরিকেরা লিখছেন সংকট ও সমাধানের পথ নিয়ে। এসব লেখা আমরা মূল পত্রিকায়ও পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করে চলছি। আমরা আর চুপ করে থাকতে চাই না। ভেজাল ও বিষাক্ত খাবার খেয়ে, দেহের ভেতরের অঙ্গগুলো পচিয়ে তিলে তিলে মরতে চাই না। প্রকৃত সমাধানে আপনার মতামতটিও হয়ে উঠতে পারে সমাধানের সূত্র। লিখুন এই মুক্ত স্বাধীন মঞ্চে। পরিবর্তনের জন্য চাই সবার সরব অংশগ্রহণ। সংগ্রাম ছাড়া এ দেশে কিছুই আদায় করা যায় না।

শওকত আলী: সমন্বয়কারী, বদলে যাও বদলে দাও মিছিল।

মন্তব্য
  • রিয়াজ রিপন জুলাই 22, 2012 at 4:58 অপরাহ্ন

    যখন খাবার পচে যেত তখন মানুষ (ব্যবসায়ী) ভাল ছিল। আর এখন মানুষ পচে গেছে জন্য খাবার পচে না। এই কথা টা কই যেন পড়েছিলাম। কথাটা খুবই সুন্দর। খাবারে রাসায়নিক মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। তারপরও সংরক্ষণ করার জন্য এই ক্ষতিকর রাসায়নিক দেওয়া হয়। এই রাসায়নিক দেওয়ার ফলে খাবার নষ্ট হয় না। কিন্তু এটা তো নষ্ট মানুষের কাজ। এসব মানুষ মননে মগজে পচে যাওয়ার কারণেই তারা ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে মানুষের ক্ষতিকর করছে। এরা মানুষ খুন করার সমান অপরাধ করছে। এদের ফাঁসির ব্যবস্থা করা উচিত।

  • A LIBRARY OF RURAL DEVELOPMENT(SAYED CHOWDHURY) জুলাই 21, 2012 at 12:04 পূর্বাহ্ন

    অনেক দিন পর লেখলেন । আগেতো দেখতাম মাঝে মধ্যে বিভিন্ন লেখায় মন্তব্য করছেন । কিন্তু এখন আর তাও খুঁজে পাইনা । আপনার লেখার মতই প্রতিটি মানুষের সচেতনতা খুবই জরুরী । আমাদের দেশের মানুষগুলো খুবই সরল । তাই যারা চালাক তারা সহজেই তাদের স্বার্থ হাছিল করে নিতে পারে । চাপা খায় সেই সরল মানুষগুলো ।
    তাই এই মানুষগুলোকে অধিকার আদায়ের ভাষা শেখাতে হবে । বোঝাতে হবে শুধু সব কিছু স্বীকার করে যাওয়াই ভালো মানুষিকতা নয় ।বরং অন্যায়ের প্রতিবাদ মুক্তি দিতে পারে অনেক পরাজয় থেকে ।
    আর এজন্যই বুদ্ধিজজিবী, তরুন সমাজ, আপনাদের মত সামনে থাকা মানুষগুলো এবং ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটি দিক নির্দেশক পান্ডুলিপি উপহার দিতে হবে । যার মূল কথা থাকবে তুমি সৎ হও আর তোমার সততায় দেশ সুন্দর হবে । আপনারা আরও বেশী লিখুন এবং বুদ্ধিজীবি দেরকে এখানে সম্পৃক্ত করুন ।ওনাদের লেখায় আমাদের মতামত গুলো ওনাদের কাছে পৌছে দিন । তারপর ফলপ্রসু আলোচনায় সমাধান একটা বের হবেই । আর এটাই হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি সৃজনশীল শান্তিপূর্ন আন্দোলন ।
    আর একটা অনুরোধ যদি পারেন সকল খাদ্যের গুনগত মান কিভাবে সংরক্ষন করলে ঠিক থাকে, কোন রাসায়নিক ব্যবহারে কোন খাবারের ক্রিয়াশীলতা কতটুকু কমে বা এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং রাসায়নিক চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াগুলো বিএসটি আই এর Procedure অনুযায়ী প্রকাশ করলে জনগন উপকৃত হতো । ধন্যবাদ । আরও লিখুন, মতামত নিন একটা ভালো পথ বের হবেই ।
    ভালো থাকবেন ।

  • Md Noyon জুলাই 19, 2012 at 2:05 অপরাহ্ন

    শওকত আলী ভাই আপনাকে ধন্যবাদ আসলে আমাদের সকলকে এই সংগ্রাম অংশগ্রহণ করতে হবে ভোক্তা অধিকার সংরণ আইন এই আইন টি র সম্পকে আরো আলোচনা করা দরকার।

© বদলে যাও বদলে দাও